Site Pages
Site Pages
Dropdown navigation
✦ Welcome to my literary world

Poems · Stories · Novel · Cultural Writings

Liakat Hossain

Poet · Writer · Jagannath University · Dhaka

19 Poems 05 Stories 04 Shelves
Liakat Hossain portrait
Liakat Hossain Literary Page · Author Profile
✍️
বাংলা সাহিত্য
Scroll ↓

কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও সাংস্কৃতিক লেখা

একই পৃষ্ঠায় লেখকের সৃজনশীল কাজগুলোকে compact, clean এবং magazine-style বিন্যাসে সাজানো হয়েছে।

📖 ডিজিটাল ফ্লিপবুক লাইব্রেরি

আমার সাহিত্যকর্ম এখন অনলাইন Flipbook আকারে পড়ুন।

Open Digital Flipbook Library

ভালবাসার স্পর্শে প্রিয় কবিতা

সংযুক্ত কবিতা সংকলনের সব কবিতা এখন একই পৃষ্ঠায় যুক্ত করা হয়েছে। উপরের সূচি থেকে যেকোনো কবিতায় দ্রুত যেতে পারবেন, এবং প্রতিটি কবিতা আলাদা compact card হিসেবে সাজানো হয়েছে।

01 বিয়োগ ব্যথায় এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
আমার বিয়োগ ব্যথায় বন্ধু ঝরে যদি তোমার আঁখি জল, নিজ হাতে সাজিয়ে দিও মোরে- ফিরে আসবে তোমার নয়নের কাজল। যদি করুন শোকে তোমার এ বুক পাষাণ হয়ে যায়, কাফনের ঐ সাদা কাপড়টা পড়িয়ে দিও- আমার সারা গায়। বেদনায় সারা শরীর যদি তোমার নিস্তেজ হয়ে আসে, কোর-আন খুলে পাঠ করিও- আমার পাশে বসে। মিছে সিক্ত হইও না তুমি চোখের পানিতে, নিজ ভালবাসায় শুয়ে দিও আমায়- ঐ নির্জন সমাধিতে। দুঃসহ বেদনায় যদি চার পাশে আঁধার ঘনিয়ে আসে, ভেবো না বন্ধু যুগ-যুগ জনম জনম- থাকব তোমার পাশে। আমার বিয়োগ ব্যথায় ভেবে ভেবে হইও না সারা, ওদের সাথে মিলে মিশে থেকো তুমি- আছে বন্ধু যারা। যতদিন তোমায় ধরে রাখবে দিবস যামি, স্বর্গের দ্বারে দাড়িয়ে বন্ধু- দেখব তোমায় আমি।
02 ভুল এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
তোমার টলমলে কাজল কালো নয়নের হাসি অনাবিল আবেগে আমায় কাছে ডেকেছিল, হৃদয়ের সবটুকু উষ্ণতা আর ভালবাসায়, হাতে নিয়ে একগুচ্ছ হাসনাহেনা ফুল, ওগো ললনা এইতো ছিল মোর ভুল। আমার হৃদয়ের মনিকোঠায় এসেছিলে তুমি জ্বালিয়ে ভালবাসার প্রদীপ শিখা, কখনো উড়িয়ে মায়াবি শাড়ির আঁচল, কখনো এলোমেলো মেঘ কালো চুল, চিনেছি দেখে তোমার লাল নীল নীল দুল, ওগো মায়াবিনী এইতো ছিল মোর ভুল। তোমার ভালবাসার পরশে পেয়েছিলাম বিধাতার স্বর্গের অসীম সুখ, কভু বাঁধন খুলিনি তোমায় হারাবার ভয়ে, হৃদয়ের শ্বেত পাথরে এঁকেছিলাম তোমায়, খোপায় পড়িয়ে পলাশ বেলি ফুল, ওগো নীল নয়না এইতো ছিল মোর ভুল। আজও নিশিত যামিনীর নির্জনে কান পেতে শুনি আকাশের ঐ চাঁদটি আমায় চুপিচুপি বলে যায়, ওগো তুমি নেই হারিয়ে গেছ অজানার মাঝে। সেই শোকে গোলাপের পাপড়িগুলো শুকিয়ে যায়, আজও আমি একা দাড়িয়ে থাকি, হাতে নিয়ে ফুল, তবে কি ভালবেসে সত্যিই আমি করেছিলাম ভুল ?
03 পাষাণী এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
যখন তুমি মলিন হতে তিমিরের শৈল সম বেদনার অভিশাপে, প্রীতি ও প্রেমের পূর্ণ বাঁধনে এ জীবন তোমায় দিতাম সঁপে। সেদিন রাগ করে কথা বলনি- যখন বলেছিলাম অভিমানী, এখন দেখি তার চেয়েও বেশি, তুমি আজ হয়েছ পাষাণী। এ অন্তর জুড়ে তোমায় নিয়ে কত ছিল আশা, সুখি হতে যেয়ে আজ তুমি ভুলে গেছো আমার ভালবাসা। যেদিন অনন্ত শয্যায় শুয়ে থাকব ঐ নির্জন মিনারের পাশে, পথিককে ডাকব একটু ফিরে চাও- দুঃসহ বেদনায় আর রাগাব না তোমায়- বলবনা একটি লিপি দাও। ওগো পাষাণী একবারও ভেবে দেখনি এ জীবনে করেছ কি সর্বনাশ! তুমি ছাড়া আজ আমি- হতাশার কাফন জড়ানো জীবন্ত লাশ। হয়তো কোন একদিন শুকিয়ে যাবে নীল সাগরের পানি, ভাবিনি কোনদিন তুমি হবে এমন পাষাণী ।
04 চাঁদনী রাতে এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
অপূর্ব এ চাঁদনী রাতে দুব্বাঘাসের উপর শিশির কনাগুলো- মুক্তদানার মত হাসে, তাকিয়ে দেখিনি মোর প্রিয়তমা চুপটি করে এসে.. কখন বসেছে পাশে । র্নিপলক দৃষ্টিতে দেখেছি পত্রের শূন্যস্থান দিয়ে ধরণীর বুকে- নেমে আসা জ্যোৎস্না, গভীর রজনীর এ নিস্তব্ধতায় কেমন করে এলে তুমি ? আমার নেই সে ভাবনা । রূপালী চাঁদের আলোয় পত্র আর পুষ্পে বিছিয়েছে শুভ্র পাটি সকল গাছে গাছে, আমি তো রাখিনি খবর মোর প্রিয়তমা কখন তুমি বসেছো- আরও অনেক কাছে । প্রকৃতির অপার নৈস্বগিক দৃশ্যেকে আজ অপূর্ব সাজে সাজিয়েছে- নয়নাভিরাম চাঁদনী রাত, অনুভব করতে পারিনি ওগো মোর প্রানের প্রিয়তমা... কখন ধরেছ হাত । আজি চাঁদনী রাতে গগনে দেখেছি অসংখ্য ঝিকিমিকি- তারা রাশি রাশি, শুনতে পাইনি প্রিয়তমা দুহাত জড়িয়ে ধরে কখন বলেছিলে- আমি তোমায় ভালবাসি । ক্ষণিকের জন্যে প্রকৃতি হতে চোখ তুলে পারিনি মোর... প্রিয়ার পানে তাকাতে, বনলতা, ডায়না আর মোনালিসা সবই যেন মলিন হল.. আজি চাঁদনী রাতে ।
05 স্বাধীনতার নায়ক এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
হে স্বাধীনতার অমর তারকা তুরঙ্গম, মেদিনীর সকল নন্দিনী নন্দন.. তোমায় জানায় স্বাগতম । বসুমতি ভরে তুমি আছ সবার অন্তরে, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সম্মান নিয়েছ জয় করে । আজ হতে তিন দশক পূর্বে- তুমি ছিলে মুকুট হয়ে জাতির মাথার উপরে। স্বাক্ষী আছে চন্দ্রমা দিনমনি তটিনী, শত্তুদের সামনে মাথা উঁচু করে দাড়িয়েছিলে, কভু ভয় করনি । বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ সন্তান তুমি স্বাধীনতার নায়ক, তোমার ডাকে সাড়া দিয়েছিল সেদিন.. ছাত্র-শিক্ষক মজুর আর গায়ক । বাংলার আকাশে বাতাসে প্রতিটি স্পন্দে- ছড়িয়ে আছে তোমার সুনাম, তারুণ্যের অগ্নিশিখায় প্রজ্জ্বলিত বঙ্গবন্ধু.. শেখ মুজিব তোমার নাম । দাবায়ে রাখতে পারেনি তোমায়- পাকিস্তানের ঐ বন্দিশালায়, আজি হিম্মত নাহি কারো- যে তোমার আদর্শ ভোলায় । তুমি বঙ্গবন্ধু, তুমি জাতির জনক, তুমি ন্যায়ের দণ্ড, তুমি স্বাধীনতার নায়ক- বাংলা মায়ের প্রান- তুমিই শিখিয়েছ মোদের শোষনের বিরূদ্ধে সংগ্রাম । আজও অন্যায় আর অত্যাচারির কালো হাত ভেঙ্গে দিতে.. শিহরী ওঠে তোমার বীরত্ব আর বর্জ কণ্ঠের কল্পনা, নিঃশেষ হয়ে যাবে এ পৃথিবী, তবু তোমায় ভুলব না ।
06 বাল্য বিবাহ এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
মাদারীপুর জেলায়- চরলক্ষীপুর নির্বাসি, সর্ব লোকে চেনে- তার নাম মোসলেম বয়াতী। ত্তিশ বছর বয়স ব্যাটার পাঁচটা পোলা মাইয়া, সংসার চালায় সে যে কৃষি কাজ করিয়া। বড় পুত্ত ছিল তার রিপন মিয়া নাম, বিবাহ করাইবে তাকে শুনতে পাইলাম। বয়স হবে পনের কি ষোল এর বেশি না, বিয়ার কথা শুইনা পোলায় মানা করল না। মোটা অংকের যৌতুক নিয়ে আনল পুত্তবধু, কে বুঝাইবে তাকে, ব্যাটায় আস্ত একটা কদু। এবার বড় ইচ্ছে জাগে তার দেখতে বংশের বাতি, তাইতো সতের বছরের ছেলে তাকে দিল এক নাতি। পুত্তকে পাঠাইল ঢাকায় খেতে তার কামাই, আবার ইচ্ছে জাগে তার দেখতে মেয়ের জামাই। টাকা পয়সা ঘটি বাটি আরও যৌতুক দিয়া, বেকার এক ছেলের কাছে দিল মাইয়া বিয়া। আদর করে মেয়ে জামাই নিল তারা ঘরে, বড় মেয়ে দিল বিয়া মাত্ত বার বছরে। সেদিন দেখা হল মাদারীপুর যাবার কালে, তাকিয়ে দেখি আস্ত একটি মেয়ে তার কোলে। বছর দুই না যেতেই দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দিবার কালে, চলে গেল পনের বছরের মেয়েটি পৃথিবীর মায়া ভুলে।
07 তুমি সুন্দরী এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
কলসী কাখে তোমায় কত সুন্দর দেখা যায়, সে কথাটি কেমন করে বোঝাব তোমায় ? তোমার সৌন্দর্য দেখতে পাই হৃদয়ের আঁখি মেলে, স্বর্ণলতিকাটিও দাড়াতে শেখে তোমার দেখা পেলে। কলসী কাখে কেন আস তুমি ভর দুপুরে ? সোনালী রোদ ঝড় তোলে তোমার পায়ের নূপুরে। জানালার পাশে বসে ইশারায় তোমায় ডাকি, আসবে বলে কলসী ভরে আমায় দাও ফাঁকি। কলসী কাখে লইবার কালে কাঁকনে তোলে সুর, তাকিয়ে থাকি, তোমায় দেখা যায় যত দুর। আবার কখন আসবে তুমি জল নিবার তরে ? সহসাই এস তুমি,যখন সূর্য নামবে ওপারে। দেখব তোমায় আঁখি মেলে থাকি যত দূর, পায়ে পড়িও সখি তোমার মায়াবী নূপুর। থেকো না বেশি ক্ষণ আমায় একা ফেলে, তখনও থাকব চেয়ে সূর্য ডুবে গেলে। তোমার অপেক্ষাতে যেন কাটাতে না হয় রজনী, কেমন কেও বোঝাব তোমায়- তুমি কত সুন্দরী ।
08 সৈয়দ আবুল হোসেন এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
শুভেচ্ছা স্বাগতম হে মানবতার প্রতীক, তুমি মহান, আজি সফল হোক তোমার আগমন । তুমি আসবে বলে... কতনা অপেক্ষার প্রহর কাটিয়েছি তোমার জন্য, তুমি আজ এসেছ আমাদের মাঝে- তাইতো আমরা সবাই ধন্য । মানব সেবা করতে এসে- তুমি বাড়িয়ে দিয়েছ শিক্ষার মান, যতকাল থাকবে এ পৃথিবী তুমি পাবে সম্মান । অনেকে বড় হতে চায় মহারাজ সেজে, তুমি বড় হয়েছ তোমার কর্মের মাঝে। এক নামে চিনে তোমায় সারা বাংলায়, মরণের পরেও তুমি থাকবে আমাদের হৃদয়। কারো তুলনা হয়না তোমার সাথে- হোকনা সে সানইয়াত, লেলিন কিংবা সূর্যসেন, তোমার তুলনা শুধুই তুমি- তুমি সৈয়দ আবুল হোসেন ।
09 তুমি আজ কত দূরে এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
তোমায় দেখি প্রতিদিন ছায়ার মত করে, তবুও মনে হয় তুমি আজ কত দূরে। তোমায় দেখার সাধ জাগে সারা বেলা, তবে কেন আজ তোমায় নিয়ে এত খেলা ? আমার কাছে তুমিতো নিষ্পাপ, ভালবাসার পঁুজারী, নি:সঙ্গ কেন তবে আজ তুমি সব কিছু ছাড়ি ? যেদিন কাছে ডেকেছিলে অনাবিল ভালবাসায়, কতনা যামিনী ভোর করেছি তোমারি প্রতীক্ষায়। তোমাকে আজও দেখতে পাই স্মৃতির পাতা খুলে, কি করে এতটা পাষাণ হব তোমার কথা ভুলে ? নয়নের অশ্রু যতই বলুক তোমাকে ভুলে যেতে, তোমাকে পারবনা হৃদয়ের মন্দির হতে সরাতে। যতই বল ভুলে যেতে ততোই থাকব- ছায়ার মত পাশে পাশে, জীবনের শেষ প্রহর গুনব সখী.. তোমায় ভালবেসে । যদি কভু আরও দূরে যাও হারিয়ে, তবুও তোমায় খুঁজে নেব ভালবাসা দিয়ে। রয়েছ তুমি হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন আর অস্তিত্ব জুড়ে, তবুও মনে হয় তুমি আজ রয়েছ কতইনা দূরে।
10 পোষা বিলাই এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
আমার পোষা বিলাই যতই তাকে কিলাই যায় না দূরে, একটু ঘুরে এসেই বলে- ম্যাও ম্যাও জলদি কোলে তুলে নাও । বিলাই আমার বিলাই যতই তাকে খাওয়াই বলতে থাকে ম্যাও ম্যাও আরও একটু দাও । আমার শখের বিলাই যেখানেই আমি পালাই.. শীতের দিনে শুতে গেলে, বিলাই আমার কেবলই বলে- শীত শীত ম্যাও ম্যাও আমায় একটু কাঁথা দাও ।
11 যেদিন আমি থাকবনা এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
তোমার হৃদয়ের করিডোরে এঁকেছি আলপনা, ইচ্ছে হলেই দেখ বন্ধু যেদিন আমি থাকবনা। কত যে প্রহর কাটিয়েছি তোমায় নিয়ে নির্জনে, কত যে বাসিছ ভাল আমায় তুমি আপন মনে। আজ কত আদরে তোমার হৃদয়েতে লেখা আমি, এলেখা যেন থাকে যতকাল রবে দিবস যামি। তোমায় দিয়েছি আমি জুঁই, চামেলী, হাসনাহেনা, কভু চোখে জল এনো না যেদিন আমি থাকবনা। মৃতু্যর অমানিশা যেদিন আমায় কাছে ডাকবে, আমার এ ভালবাসা সেদিনও তোমার থাকবে। আমায় ভুলে যেও যদি নাহি আসে কভু কল্পনা, ভালবাসা ভুলনা তুমি যেদিন আমি থাকবনা। আমায় খুঁজে নিও তুমি আকাশের তারার মাঝে, যতকাল থাকবে এ ধরণীতে মানবীর সাজে। বিদায়ের বেলা কিছুই চাইবনা তোমার কাছে, রজনীগন্ধা হয়ে থেকো মোর সমাধীর-ই পাশে। হয়তো বুনো ঘাসে ছেয়ে যাবে আমার-ই সমাধী, একবিন্দু অশ্রু ফেলনা তুমি স্মরণে আসি যদি।
12 ভালবাসি এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
এসেছ ভালবাসার প্রদীপ হাতে আমার এ আঁধার জীবন, ভালবাসি ভালবাসব যতকাল থাকব এ সুন্দর ভুবণে। সৌদামিনীর মত তোমার বাহু যুগলে কতনা রূপের ছটা, যেখানে যাই তোমার কাছে থেকে যায় এ অবুঝ মনটা। দেখেছি গোলাপের পাপড়িতে অপূর্ব শিশিরের হাসি, সবই তুচ্ছ মনে হয়, যখন শুধুই তোমায় ভালবাসি। যদি কভু মলিন হও তিমিরের শৈল সম বেদনার অভিশাপে, প্রীতি ও প্রেমের পূর্ণ বাঁধনে এজীবন তোমায় দিব শপে। গোধুলীর শোভা দেখেছি আমি পারাবারের সৈকতে আসি, জুড়ায়নি আঁখি তাতে মন বলে শুধুই তোমায় ভালবাসি। যতই সুন্দর হোক রংধনু সেতো থাকে সুদুর আকাশে, চাইনা দেখতে রঙের খেলা যদি তুমি থাকো মোর পাশে। অরবিন্দু আহরণ করিতে খুঁজেছি শলিল রাশি রাশি, কন্টক বাধা সামনে এসেছে, তবু বলেছি তোমায় ভালবাসি। যদি কভু দেবতার বরে প্রাণ নাশে অরণ্যের আশিবিষে, বিধাতার কাছে করব ফরিয়াদ তোমায় ভালবেসে। আবিরের সোনালী আভায় যদি হারিয়ে যায় সকল স্মৃতি, নতুন করে সাজাব তোমায় প্রিয় ফুলের প্রিয় মালা গাথি। চন্দ্রমার নয়নাভিরাম আলো যদি কেড়ে নেয় অমা-অন্ধকারে, পুষ্পের শোভায় সাজিয়ে রাখব তোমায় মনের মন্দিরে। আসে যদি অপশক্তি খড়ক, কৃপাণ হাতে সমরের বেশে, ভালবাসার পবিত্ত বাঁধনে রাখব বেঁধে ভয় বল কিশে। মরণ যেদিন ডাকবে আমায় আপন আলয় আসি, সেদিনও বলব আমি- আজও তোমায় ভালবাসি।
13 জয় পরাজয় এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
বিজয়ের সন্ধ্যানে খুঁজে পেলাম পরাজয়, জীবন চলার পথে আছে অনেক সংশয়। কারো আসে বিজয় কারো পরাজয়, ভুল করে কেউ ভুক্তভোগী সেজনা আশায়। কর কর্ম পাবে ফল এরই নাম মনোবল, কেউ হাসে কেউ কাঁদে কেউ বলে বাড়ি চল। এ কেমন আশা তোমার ভাব শুধু একা ? কর সংগ্রাম পেতে হলে বিজয়ের দেখা। কেউ আগে কেউ পরে এটাই তো নিয়ম, অতীতকে ভুলে যাও ভবিষ্যতকে কর স্মরণ। হার জিৎ বড় নয় জ্ঞানীদের কথা, জীবনের পরাজয়ে পেয়ো না গো ব্যথা। প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ যাবে না গো বৃথায়, বিজয়ের আলো পাবে তুমি করলে অধ্যাবসায়। এখন আর ভেবে ভেবে মনকে করো না ভার, কর চেষ্টা একদিন সাফল্য আসবে তোমার। প্রতিযোগিতা যতই কঠিন হোক করো না ভয়, যেখানে থাকবে পরাজয় সেখানেই হবে জয়। যেজন দেখেনি কভু জীবনের কঠিন পরাজয়, জীবনকে কিকরে চিনবে সেজন থাকতে এ ধরায় ? কখনো ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আসে দুঃসময়, তাইতো ব্যথা ভরা হৃদয় নিয়ে সবই মেনে নিতে হয়।
14 উপহাস এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
আমাকে দেখে তোরা কেন করিস উপহাস ? তোদের উপহাস একদিন আমি করিব প্রকাশ। এখন আমি তোদের মাঝে সবার চেয়ে ছোঞ্জ, থেমে যাবে তোদের উপহাস যেদিন আমি হব শ্রেষ্ঠ। উপহাস যতই করিস বাড়িবে আমার মান, জানি একদিন ধ্বংশ হবে তোদের সম্মান। উপহাস করিস না আমায় বলি ওগো শোন, একদিন হব আমি তোদের আপনজন। তাই বলে তোরা কেহ করিস না ভয়, ভালবেসে তোদের হৃদয় করব জয়। আদর সোহাগ তোদের আমি দিব স্বযতনে, তাই এখন থেকে উপহাস ভুলে যা আপন মনে। উপহাসের প্রতীকতো কারো গায়ে লেখা নহে, তবে কেন সহায়হীনকে দেখলে ওরা উপহাস কেও ? আমরা সবাই মানুষ একই বিধাতার সৃষ্টি, কেন রাখিস তবে আমার পানে উপহাসের দৃষ্টি ? উপহাসের বাণী শুনিয়ে মোরে করিস না ভার, একদিন আমি কুটলী ভাংচুর করিব ধরার। ভাল কাজে কেউ যদি পায় কভু লাজ, উৎসাহ দিস তাকে হয় যদি শুভ কাজ। অসহায় ভেবে কেউ যদি করে কারো সর্বনাশ, আপন করে নিস তাকে করিস না উপহাস। আবার যদি কভু উপহাস করিস আমায়, যায় যাবে প্রাণ তাহে করিব না ভয়।
15 প্রাপক এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
শুভেচ্ছা নিও, সবাইকে আমার সালাম দিও। তোমার পত্র পেয়েছি, এখন রায়পুর আছি। প্রথম পত্র পাই নাই, তোমার কথা ভুলি নাই। তোমার ছিলাম তোমারই থাকব, শীঘ্রই বেড়াতে আসব। মানুষকে ভালবেস, ঈদের সময় বাড়ি এস। ভাল আছি ভাল থেকো, মনে চাইলে আবার লিখ। ইতি তোমার প্রিয় নাম, এই পর্যন্তই লিখলাম।
16 বাংলা মা এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
হৃদয়ের মনিকোঠায় লেখা মাগো তোমার নাম, ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়- আমরা তোমায় পেলাম। সেযে আমার জীবন মরন বাংলা মাগো তুমি, সারা অন্তর জুড়ে আছো- এক টুকরো ভুমি। তোমার জন্য হাঁসি মাগো গাহি তোমার জন্য, তোমায় পেয়ে তাই আমরা সবাই ধন্য। মাগো তুমি শিশিরের এক বিন্দু কনা নও, যেন নিমিশেই ঝড়ে যাবে- চিরদিন হৃদয় জুড়ে রবে। মাগো তুমি গোলাপের হাসি মুক্তার দানা, যত দেখি তোমায় তবু মন ভরে না। মাগো তুমি কৃষকের হাসি শিশুর কোমল গাল, হৃদয় জুড়ে থেকো মাগো অনন্তকাল। তুমি প্রকৃতির শ্যামল শোভা, কাশ ফুলের মত শুভ্রতা, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া- মাগো শুধুই তোমার মমতা। বাংলার নদী-নালা, খাল-বিল সাগরের জলে, মাগো সর্বত্তই শুনতে পাই তোমার কথা বলে। মাগো তুমি দিনের আলো রাতের জ্যোৎস্না, তোমার তুলনা শুধুই তুমি, তুমিই বাংলা মা। তোমার বুকেই কাটাব জীবন ভুলে সকল হিংসা বিদ্বেষ, তুমিই আমার জন্মভুমি- প্রিয় বাংলাদেশ ।
17 মন এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
মন সেতো মনোরাজ্যের এক অভিনব রঙ্গভুমি, কভু লোকালয়ে কিংবা অন্তপুরে দেখেছো কি তুমি ? সেযে পাষাণ আর ভালবাসার পুঁজারী, অতৃহ্মচিত্তে গ্লানী সয়েছে কতনা অভিসারী। মন সেতো কুয়াশায় ঢাকা তুষার রাশি, সহস্র আনন্দ আর বেদনা জমা হয় আসি। কখনো উষ্টহ্ম সমীরণে গলে গলে হয়ে যায় পানি, কভু দুঃসহ যন্ত্রনায় নিজেই সাজে পাষাণী। মন সেতো সিক্ত গোলাপের একবিন্দু শিশিরের কনা, করুণ রোদনের ক্ষণটুকু বুঝি আর শেষ হয় না। দিনমনির দর্শণে সেজে নিমিশেই ঝড়ে যায়, কভু ব্যর্থতার অলস তন্দ্রায় ঝিমিয়ে পড়ে মূর্ছনায় । মন সেতো শক্ত হীরকের কণা, কঠিন ঝড় আর সাইক্লোনেও নুয়ে পড়ে না। অনলের অনুতাপে হয়না সে কিঞ্জিৎ মলিন, অটল শৈলের মত অটুট রয় সারাদিন। ব্যর্থ আশায় হয়না হতাশ ললনার ছলে, লজ্জাবতীর মত থাকেনা লুকিয়ে আড়ালে। কলমীর নৃত্য আর কলকণ্ঠের অবিনাশি সুর, মন সেতো যাবেই ছুটে থাকনা যতই দূরে। প্রেমের স্বর্গবাগিচা তৈরি হয় এই মনে, ভালবেসে কাছে টানে দুজন দুজনে। কান্তার মহারাজ বিটপীদের মধ্যমনি শণ, তারি তুল্য এ ভূবনে শুধু মানুষের-ই মন ।
18 তুমি নেই বলে এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
এত পানি কেন তোমার চোখে ? কই! না-তো !! তবে এত ভাব কেন তুমি ? কই...ও...তাই বল। যখন মেঘাচ্ছন্ন আকাশে ধ্বনিত হয়.. প্রচণ্ড মেঘের বজ্রধ্বনি, তখন সেই বজ্রাঘাত মুছে দিতে- দু’নয়নের পাতা ভেদ করে- লোকালয়ে বেরিয়ে আসে একফোটা অশ্রুবিন্দু । একেই কি বলবে তুমি চোখের পানি ? আজও ভোরের কোকিলের সুরে হাসনাহেনার মায়াবী সুবাসে- আকাশের তারাগুলো মিটিমিটি জ্বলে। তুমি কি এমন-ই পাষাণী !! একবারও কি বুঝতে পারো না ? আমি আজ ভাবি তুমি নেই বলে । তুমি নেই বলে, বাজে না আজ মায়াবীণ, ওঠে না আকাশে শুকতারা- ফোটে না কাননে কুসুম- জ্বলে না সন্ধ্যা প্রদীপ- তবুও কেন তুমি আসবে না ? আর কত কাঁদাবে ভ্রান্তির ছলে ? সবই আঁধার আজ- শুধু তুমি নেই বলে ।
19 তুমি এফ.এম. লিয়াকত হোসেন +
এফ.এম. লিয়াকত হোসেন
তুমি কাননের নিষ্পাপ চামেলী, গোলাপ, নাকি হাসনাহেনার মায়াবী সৌরভ ? তুমি ভোরের কোকিলের অবিনাশী সুর, নাকি অমাবশ্যায় পূর্ণিমার চাঁদ ? তুমি শিশিরের অপূর্ব হাসি রাশি-রাশি, যেন সারাক্ষণ তোমায় ভালবাসি। তুমি বিধাতার আশীর্বাদে অপরূপ সৃষ্টি, নাকি আষাঢ়ের রিমঝিম বৃষ্টি ? তুমি অরবিন্দু শোভিত কুন্তলা নন্দিনী, নাকি মেঘাচ্ছন্ন আকাশের সৌদামিনী ? তুমি ধরণীর রূপসী অটল পুষ্পের বিহারিণী, নাকি অনন্ত ভালবাসার পুঁজারী ? তুমি আমার গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাকি জীবনানন্দের প্রিয় বনলতা ? তুমি মমতাজ, ডায়না, মাদার তেরেসা, যেন লিওনাদ্রোর তুলির মোনালিসা। তুমি আমার হৃদয়ের রক্তিম ভালবাসা, নাকি অন্য কারো মনের আশা ? তুমি নবজাত শিশুর নরম তুল তুলে গাল, হৃদয় মাঝে বেঁচে থেকো চিরকাল ।

গল্প ও স্মৃতির পাতাগুলো

আগের সব গল্প এবং নতুন সংযুক্ত PDF সহ প্রতিটি গল্প এখন আলাদা card-এর ভেতর পূর্ণ পাঠ হিসেবে বসানো হয়েছে—যাতে page থেকেই সরাসরি পড়া যায়।

📖 গল্প সূচি
01ভালোবাসার নীল আকাশ 02“ভালবাসি” হয়নি বলা 03ভালোবাসার পরিণাম 04কলেজে প্রথম দিন 05শীতের সবুজ

প্রতিটি গল্পের card-এর ভেতরে full text রাখা হয়েছে। card-এর ভিতরের অংশ scroll করে পুরো গল্প পড়া যাবে; compact look বজায় রাখতে text area নির্দিষ্ট উচ্চতায় রাখা হয়েছে।

01

ভালোবাসার নীল আকাশ

প্রথম ভালোবাসার স্মৃতিভিত্তিক গল্প

ডায়েরির পাতা থেকে শুরু হওয়া সাগর ও লতার প্রথম ভালোবাসা, বাস্তবতার কঠিন ঢেউ এবং কালো গোলাপের বেদনাময় অমর স্মৃতি।

প্রথম প্রেমস্মৃতিভিত্তিকআবেগঘন
📄 PDF পড়ুন⬇️ PDF Downloadসূচিতে যান

প্রথম ভালোবাসার স্মৃতিভিত্তিক গল্প

লেখক: লিয়াকত হোসেন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

সাগর ও লতার গল্প

প্রস্তাবনা: নীল আকাশের নিচে

প্রথম ভালোবাসা কখনো শুধু একটি সম্পর্কের নাম নয়; সে হলো জীবনের বুকের ভেতর গোপনে রাখা এক নরম দীপশিখা। সময়ের বাতাসে কত দিন, কত মুখ, কত ঋতু হারিয়ে যায়; তবু যে নাম একবার হৃদয়ের নীল আকাশে মেঘের মতো ভেসে ওঠে, তাকে আর পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। সে থেকে যায় - কখনো দীর্ঘশ্বাসে, কখনো একাকী জানালার পাশে, কখনো রাতের নীরব প্রার্থনায়।

সাগর ও লতার গল্পও তেমনই এক সত্য স্মৃতি - আবেগ ও অনুভূতির ভেজা পাতায় লেখা। এখানে আছে প্রথম দেখা, ডায়েরির পাতায় লুকোনো কবিতা, চাঁদনী রাতের মায়া, নদীর ঢেউ, অক্ষমতার কঠিন বাস্তবতা এবং একটি কালো গোলাপ, যার গন্ধে শেষ মুহূর্তেও ভালোবাসা অমর হয়ে থাকে।

এই গল্পে প্রেম ফুলের মতো কোমল, আবার ভাগ্যের মতো নির্মম। এখানে কারও চোখের জল শুধু জল নয়; তা হয়ে ওঠে স্মৃতির সিঁদুর, অপ্রাপ্তির নীল ছায়া, আর এক অসমাপ্ত জীবনের গভীরতম কবিতা।

এক. ডায়েরির হারিয়ে যাওয়া পাতা

কলেজের ফার্স্ট ইয়ারেই ওদের প্রথম পরিচয়ের পথ খুলে যায়। সেদিন কলেজ ছুটির পর সবাই যার যার গন্তব্যে ছুটছিল। রাস্তার পাশে বাস-টেম্পুর শব্দ, বন্ধুদের হাসি, কিশোর যৌবনের অস্থির বাতাস - সব মিলিয়ে বিকেলটা ছিল খুব সাধারণ। অথচ জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পগুলো অনেক সময় এমন সাধারণ বিকেলের বুকেই নীরবে জন্ম নেয়।

লতা তার এক বান্ধবীকে নিয়ে পাশের রেস্টুরেন্টে বসেছিল। সামনে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ, পাশে তার প্রিয় ডায়েরি। কথার ফাঁকে ফাঁকে কখন যে গাড়ির শব্দে তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়ল, খেয়ালই রইল না - ডায়েরিটি রেস্টুরেন্টের টেবিলেই পড়ে রইল, যেন নিজের অজান্তে সে তার হৃদয়ের দরজাই সেখানে রেখে গেল।

সাগর রেস্টুরেন্টে ঢুকেই ডায়েরিটি দেখতে পেল। ভেতরে নাম-ঠিকানা লেখা। প্রথমে ভাবল, সরাসরি ফিরিয়ে দেবে; কিন্তু কৌতূহল কখনো কখনো ভাগ্যের দূত হয়ে আসে। সে পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। বিকেলের আলো নিভে আসছিল, আর সাগর যেন এক অচেনা মেয়ের মনের জানালার সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে গেল।

ডায়েরিতে কয়েকটি কবিতা ছিল। শব্দগুলো হয়তো খুব পরিণত ছিল না, কিন্তু তার ভেতর ছিল কাঁচা আবেগের নির্মল উষ্ণতা। প্রতিটি পঙ্‌ক্তি পড়ে সাগরের মনে হলো, এই ডায়েরি কাগজের বাঁধাই নয় - এ যেন কারও নিঃসঙ্গ আকাশ, যেখানে মেঘের আড়ালে জমে আছে চাঁদের আলো।

সেদিন রাতে ডায়েরি হাতে নিয়েই সাগর ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের ভেতরেও শব্দগুলো তাকে ডাকতে লাগল। বুকের ভেতর যেন অচেনা বসন্তের প্রথম বাতাস বইতে শুরু করেছে। সে স্থির করল - পরদিন কলেজে গিয়ে লতা নামের সেই মেয়েটির সঙ্গে দেখা করবেই।

দুই. প্রথম দেখা, প্রথম কম্পন

পরদিন সাগর তার বন্ধু তমালকে সঙ্গে নিয়ে লতাকে খুঁজতে লাগল। পাশেই লতা তার কয়েকজন বান্ধবীর সঙ্গে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। এমন সময় তমাল তাকে ডেকে সাগরের কাছে নিয়ে এল। সাগর আর লতা মুখোমুখি দাঁড়াল—দুজনেই চুপ, কেউ কাউকে কিছুই বলতে পারছে না; যেন পৃথিবীর সমস্ত লজ্জা তাদের দুজনকে নীরবে আলিঙ্গন করে আছে।

মনে হচ্ছিল, এর আগে কেউ কাউকে কখনো দেখেনি, অথচ অদৃশ্য কোনো টান, কিংবা সুমধুর কোনো সুর, কলেজের সেই প্রথম দিন থেকেই তাদের নীরবে কাছাকাছি টেনে এনেছে।

তমাল মৃদু হাসিতে বলল, “তুমি-ই তাহলে সেই লতা, যে আমার বন্ধুর রাতের আকাশে নীরবতা নিয়ে এসেছে?”

লতা মুচকি হেসে বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু কেন বলো তো, আমি কী করেছি?”

তমাল উত্তর দিল, “সে আর আমার বলতে হবে না। আমি বরং যাই, তোমরা গল্প করো।” তমাল চলে যেতেই সাগর কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ডায়েরির কথা বলল।

লতা বুঝতে পারল, আগের দিনের তাড়াহুড়োয় হারিয়ে যাওয়া ডায়েরিটি তারই। সে ডায়েরিটি হাতে নিল। ঠোঁটে যে হাসি ফুটল, তা ছিল ভোরের পাতায় জমে থাকা শিশিরের মতো নির্মল।

“আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না,” লতা বলল। “শুধু ধন্যবাদ বললে হয়তো খুব কম বলা হবে।”

সাগর তখনও ডায়েরির কবিতার ঘোরে। সে বলল, “আপনার কবিতাগুলো খুব সুন্দর। নিশ্চয়ই আপনি কবিতা ভালোবাসেন?”

লতা নরম কণ্ঠে উত্তর দিল, “যারা কবিতা ভালোবাসে, শুধু তারাই কবিতার প্রশংসা করতে জানে। আপনার কথাগুলোও তো কবিতার মতো।”

সেদিন তাদের কথা খুব বেশি হয়নি; কিন্তু সব কথা কি শব্দের দৈর্ঘ্যে মাপা যায়? কিছু কিছু সংলাপ থাকে, যা সামান্য উচ্চারণ হয়েও সারা জীবনের ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে বাজে। বিদায়ের আগে দুজনের চোখে যে অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠেছিল, সেটিই ছিল প্রথম ভালো লাগার নীরব স্বাক্ষর।

তিন. ডায়েরির ভাঁজে লেখা গোপন বাক্য

লতা বাড়ি ফিরে ডায়েরির পাতা উল্টাতে গিয়ে থমকে গেল। একটি পাতায় সাগরের লেখা - “লতা, তোমার কবিতাগুলো যত সুন্দর, হয়তো তুমি তার চেয়েও বেশি সুন্দর। ভুল বললে ক্ষমা করে দিও।”

একটি মাত্র বাক্য; অথচ সেই বাক্য লতার বুকের ভেতর অচেনা ঢেউ তুলল। তার মনে হলো, কেউ যেন খুব আস্তে এসে তার নিঃসঙ্গ জানালায় আলো রেখে গেছে। সে বুঝতে পারল না - এটি শুধু প্রশংসা, না কি জীবনের নতুন কোনো দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ।

সেই রাতের ঘুম তার চোখে নেমে এল ঠিকই, কিন্তু ঘুমের ভেতরেও নীল আকাশে এক অপরিচিত মুখ ভেসে রইল। লতা প্রথমবার নিজের হৃদয়ের শব্দ শুনতে পেল - মৃদু, কাঁপা, অথচ অপূর্ব মধুর।

লতা ছিল বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। ছোটবেলাতেই মাকে হারিয়েছিল। সৎমা আর একজন মহীয়সী পিতার স্নেহে বড় হলেও তার শৈশবের আকাশে এক টুকরো শূন্যতা সব সময় রয়ে গিয়েছিল। জীবন তাকে খুব অল্প বয়সেই শিখিয়েছিল - হাসির আড়ালেও মানুষ কত ব্যথা লুকিয়ে রাখে।

অন্যদিকে সাগর ছিল বাবা-মায়ের আদরের একমাত্র ছেলে। নিরাপদ সংসারের ছায়ায় বড় হলেও তার ভেতর ছিল কবিতা পড়ার নেশা, মানুষের মন বোঝার ক্ষমতা, আর অনুভূতিকে সম্মান করার নরম দৃষ্টি। হয়তো এই কারণেই লতার ডায়েরির শব্দগুলো তার হৃদয়ে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

চার. নীল আকাশে দুটি নাম

এরপর নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হলো। কথা বাড়ল, অপেক্ষা বাড়ল, নীরবতার মধ্যেও একে অন্যকে খোঁজার অভ্যাস বাড়ল। ডায়েরির পাতা থেকে কবিতা এসে দাঁড়াল বাস্তব জীবনের জানালায়। ভালো লাগা ধীরে ধীরে ভালোবাসায় রূপ নিতে লাগল - কোনো ঘোষণা ছাড়াই, কোনো শপথ ছাড়াই, যেন নদী নিজে নিজেই সাগরের দিকে চলে যায়।

নবযৌবনের হৃদয়-আকাশে তখন সোনালি সূর্য উঠছে। কখনো চিঠির মতো করে মনের কথা বলা, কখনো চাঁদনী রাতের আলোয় চোখের ভাষা পড়া, কখনো কেবল পাশাপাশি হাঁটা - এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের পৃথিবীকে বড় করে তুলল।

লতা যখন হাসত, সাগরের মনে হতো শীতের সকালে কুয়াশা সরিয়ে সূর্য উঠেছে। আর সাগর যখন নীরবে তাকিয়ে থাকত, লতার মনে হতো, কেউ তার ভেতরের দীর্ঘদিনের একাকিত্বটুকু খুব মমতায় পড়ে ফেলছে।

দুজনেই প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করল। সাফল্যের আনন্দে তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হলো। এরই মধ্যে সাগরের বাবার পদোন্নতি ও বদলির খবর এল। বাসা পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ল। সাগর মনে মনে চাইছিল, শাস্তিনগরে বাসা হলে ভালো হয়। ভাগ্য যেন সেদিন প্রেমিকের প্রার্থনা শুনে ফেলল - নতুন বাসাটি হলো লতাদের বাড়ির একেবারে পাশে।

ভালোবাসার প্রথম সোপান পেরোনোর পথে এ যেন এক মধুর আশীর্বাদ। জানালার দূরত্ব কমে গেল, দেখা করার অজুহাত বাড়ল, আর হৃদয়ের মাঝখানের নিঃশব্দ ফাঁকটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।

পাঁচ. পাশাপাশি পথচলা

লতা একদিন সাগরকে নিজের বাড়িতে এনে বাবা-মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। সাগরের পরিবারের সঙ্গে লতার পরিচয়ের প্রয়োজন হলো না; কারণ পাড়া-প্রতিবেশীর সহজ সম্পর্কের মধ্যে সে পরিচয় অনেক আগেই হয়ে গিয়েছিল।

পরবর্তীতে তারা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধীনে অনার্সে ভর্তি হলো। প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে। সাগর আর লতা প্রায়ই একসঙ্গে ক্যাম্পাসে যায়, একসঙ্গে ফেরে। ভিড়ের মধ্যে তারা দুজন নিজেরাই আলাদা এক পৃথিবী তৈরি করে নিত - যেখানে অন্য মানুষের কোলাহল থাকলেও হৃদয়ের কথাই সবচেয়ে স্পষ্ট শোনা যেত।

কখনো বইয়ের পাতায় পড়া কোনো কবিতা নিয়ে কথা হতো, কখনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে। লতা বলত, “একদিন তুমি অনেক বড় হবে, সাগর।” সাগর হাসত, “তুমি পাশে থাকলে বড় হওয়ার পথও তো সহজ লাগে।” সেই কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যেত, কিন্তু দুজনের বুকের ভেতর গোপন অঙ্গীকার হয়ে জমে থাকত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভালোবাসা প্রকৃতির নিয়মেই এগিয়ে চলল। একজন অন্যজনকে ছাড়া যেন সবকিছুই অর্থহীন। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ আছে, অথচ পরস্পরের অনুপস্থিতিতে পুরো পৃথিবীটাই তাদের কাছে নির্জন মরুভূমির মতো মনে হতো।

ছয়. নদীর ঢেউ, জীবনের প্রশ্ন

একদিন নৌকাবাইচ দেখতে গিয়ে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। নদীর তীরে উৎসবের কোলাহল, মানুষের উল্লাস, ঢেউয়ের দোল - সব মিলিয়ে মুহূর্তটি ছিল আনন্দে ভরা। কিন্তু হঠাৎই তাদের নৌকাটি ডুবে গেল। লতা সাঁতার জানত না।

সাগরের সামনে তখন কোনো হিসাব ছিল না, কোনো ভয় ছিল না; ছিল শুধু একটাই সত্য - লতাকে ছাড়া সে তীরে উঠবে না। সে বুকের ভেতর লতাকে জড়িয়ে ধরে স্রোত, আতঙ্ক আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করল। অনেক কষ্টে তীরে উঠল দুজন। মানুষ সাগরের সাহসের প্রশংসা করল; কিন্তু সাগরের কাছে তা বীরত্ব নয়, ভালোবাসার স্বাভাবিক দায়িত্ব।

দুজনেই তখন মহাক্লান্ত। তবু মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে লতা কাঁপা হাসিতে বলল, “কিছু হয়নি।” সত্যিই কি কিছু হয়নি? নাকি ভালোবাসা এমনই - ভয়ের কাঁপুনিকেও প্রিয়জনের সামনে হাসির আড়ালে ঢেকে রাখে?

পরদিন সকালে তারা গল্প করতে করতে কলেজে যাওয়ার কথাই ভুলে গেল। লতা আগের দিনের প্রসঙ্গ টেনে মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আমি যদি সত্যিই পানিতে ডুবে মারা যেতাম, তাহলে তুমি কী করতে, সাগর?”

সাগর থেমে গেল। তারপর বলল, “তোমাকে হারালে আমি সত্যিই পাগল হয়ে যেতাম।”

“পাগল হয়ে কী করতে?” লতা চোখ নামিয়ে জানতে চাইল।

সাগর খুব ধীরে বলল, “বোকা মেয়ে, বুঝতে পারছ না? তোমাকে এভাবেই জড়িয়ে ধরে রাখতাম - যেন কোনো ঢেউ, কোনো অন্ধকার, কোনো মৃত্যু তোমাকে আমার বুক থেকে আলাদা করতে না পারে।”

লজ্জায় লতার চোখের পাতা নেমে এল। মুহূর্তটি নদীর জলের মতো কাঁপছিল, কিন্তু সেই কাঁপুনির ভেতর ছিল গভীর নিশ্চয়তা - তারা দুজন একে অপরের জীবনের সঙ্গে বাঁধা পড়ে গেছে।

সাত. অশরীরী আশঙ্কা

হঠাৎ একদিন লতা প্রচণ্ড মাথাব্যথা অনুভব করল। সবাই অবাক; আগে কখনো এমন হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যে অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও সাগরের জন্য সেই তিনটি দিন ছিল ভারী, দীর্ঘ, শ্বাসরুদ্ধকর। প্রতিটি ঘণ্টা যেন পাথরের মতো তার বুকের উপর চাপা পড়ে থাকল।

সুস্থ হয়ে লতা সাগরের কাছে এল। সাগরের কপালে হাত রেখে নরম কণ্ঠে বলল, “তোমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, তাই না?”

সাগর চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল। লতা হেসে বলল, “আমার কিছু হয়নি, মহারাজ। দেখছ না, আপনার সামনে এক জীবন্ত অষ্টাদশী দাঁড়িয়ে আছে।”

কিন্তু সেই হাসির আড়ালে যেন অদৃশ্য এক ভয় দাঁড়িয়ে ছিল। লতা হঠাৎ বলল, “আজ তোমাকে একটি প্রশ্ন করব। সত্যি সত্যি উত্তর দেবে?”

“দেব,” সাগর বলল।
“আমাকে তুমি কোনোদিন ভুলে যাবে না তো?”

সাগর বিস্মিত হলো। “তোমাকে কীভাবে ভুলব, লতা? তুমি তো আমার হৃদয়ের সবটুকু জায়গা জুড়ে আছ। তুমি না থাকলে আমার ভেতরটা যেন শব্দহীন আকাশ হয়ে যাবে।”

তারপরও লতার বুকের অজানা কাঁপুনি থামল না। সে নিজের লেখা ‘বিয়োগ ব্যথা’ কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি আবৃত্তি করল।

কবিতার ছায়ায়

“আমার বিয়োগ-ব্যথায়, বন্ধু, ঝরে যদি তোমার আঁখিজল, নিজ হাতে সাজিয়ে দিও মোরে - ফিরে আসবে তোমার নয়নের কাজল।”

সাগর তাড়াতাড়ি তাকে থামিয়ে দিল। “এমন করে বলো না, লতা।” সে লতার মাথা বুকে টেনে নিল। কিন্তু সেই বুকের আশ্রয়েও লতার চোখে যেন দূরের অন্ধকারের ছায়া লেগে রইল। সেদিন থেকেই লতার মুখে এক ধরনের উদাসীনতা দেখা দিতে লাগল - যেন অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো অনিবার্য বিদায় সে একা একা দেখতে পাচ্ছে।

আট. রোগের নাম, নিঃশব্দ বিদায়

অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার আর খুব বেশি দিন বাকি নেই। সাগর পড়াশোনায় মন দিতে চেষ্টা করছে। অন্যদিকে লতার পড়ার টেবিলে বসে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কখনো অকারণ মাথা ঘোরে, কখনো অসহ্য যন্ত্রণায় সে প্রলাপ বকে। বইয়ের অক্ষরগুলো তার চোখে ঝাপসা হয়ে যায়, অথচ সাগরের মুখটি আশ্চর্যভাবে পরিষ্কার ভেসে ওঠে।

লতার বাবা-মা সাধ্য অনুযায়ী চিকিৎসার চেষ্টা করলেন। প্রথমে সদর হাসপাতালে, তারপর ঢাকার ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেওয়া হলো। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার জানালেন - মস্তিষ্কে ক্যানসার। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সেই সামর্থ্য লতার পরিবারের ছিল না।

প্রথমে লতাকে সত্যিটা বলা হয়নি। কিন্তু ব্যথা কখনো পুরোপুরি লুকানো যায় না; মানুষের চোখ, নিঃশ্বাস, ঘরের নীরবতা - সবই একসময় সত্যের ভাষা হয়ে ওঠে। কিছুদিনের মধ্যেই লতা বুঝে গেল, তার জীবনের প্রদীপটা ধীরে ধীরে নিভে আসছে।

লতা সাগরকে অনুরোধ করল, একটি কালো গোলাপের চারা এনে দিতে। সাগর তখন নিজের পরীক্ষা, ভবিষ্যৎ আর অক্ষম ভয়ের ভেতর জড়িয়ে পড়েছে। হয়তো সে লতার চোখের গভীর অনুরোধ সহ্য করতে পারছিল না; হয়তো মৃত্যুর ছায়ার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিল। তাই ধীরে ধীরে লতাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল।

তবু একদিন সে একটি কালো গোলাপের চারা এনে দিল। চারা হাতে পেয়ে লতা শিশুর মতো খুশি হলো। তার কণ্ঠে তখন ব্যথা, অথচ সেই ব্যথার ভেতরও প্রেমের আলো। সে বলল, “আমার জীবনের ফোটা ফুল হয়তো আমি দেখে যেতে পারব না; তাই নিজের হাতে লাগানো এই প্রিয় ফুলটি যেন অন্তত দেখে যেতে পারি।”

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই তার চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এল। সেই অশ্রু ছিল পাহাড়ের নীরব কান্নার মতো - ধীরে ধীরে ঝরছে, কিন্তু থামছে না। লতা জানালার দক্ষিণ পাশে মমতায় গোলাপগাছটি লাগাল। গাছটি ধীরে ধীরে সতেজ হলো, আর লতার জীবনপ্রদীপ ততই নিভু নিভু করে জ্বলতে লাগল।

নয়. দূরত্বের দেয়াল

সাগর পরীক্ষা দিতে গেল, কিন্তু লতাকে একবার জানানোও প্রয়োজন মনে করল না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে লতা তার জন্য দোয়া করল - সাগর যেন ভালো ফল করে, তার জীবন যেন থেমে না যায়। ভালোবাসা কখনো কখনো এতটাই নিঃস্বার্থ হয় যে, নিজের কান্নাকেও প্রিয়জনের সাফল্যের কাছে নীরবে উৎসর্গ করে দেয়।

লতা বুঝে গেল, সাগরের জীবনে লতা নামের মেয়েটির প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছে। হয়তো তার অসুস্থতা সাগরের স্বপ্নের পথে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তাকে বিরক্ত করাও আর ঠিক হবে না।

সাগরের পরীক্ষা শেষ হলো। তবু সে এল না। কখনো বাড়িতে এলে লতা ছুটে যেতে চাইত; কিন্তু সাগর চোখ ফিরিয়ে নিত। লতা আর তাকে জোর করল না। নিজের ভেতরে সে বলল - “আমার অন্ধকার জীবনে তাকে জড়িয়ে আর কী হবে? আমার জন্য যদি তার জীবন নষ্ট হয়, তবে তার সুখের জন্য আমাকেই সরে যেতে হবে।”

বাস্তবতার কঠিন ঝড়ে লতার আশার শেষ আলোকশিখাটুকুও নিভে গেল। চার দেয়ালের ভেতর বন্দি পাখির মতো তার দিন কাটতে লাগল। উঠতে দাঁড়াতেও কষ্ট হয়। তবু মাঝে মাঝে সে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে - সেই জানালার বাইরে তার কালো গোলাপগাছ।

একদিন অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে মিনতি করল, “ওগো, ওই জানালাটা খুলে দাও। আমি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে চাই। আমি নয়ন ভরে দেখতে চাই আমার ভালোবাসার নীল আকাশ। আমার পায়ের শক্ত শিকলটি খুলে দাও - একবার শুধু প্রকৃতির কাছে যেতে চাই।”

কেউ শুনল না। অথবা শুনেও কেউ বুঝল না। যন্ত্রণার দিনগুলো নদীর স্রোতের মতো বয়ে যেতে লাগল। মাটি যেন পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে; আর লতা অপেক্ষা করছে এমন এক শেষ মুহূর্তের জন্য, যার পরে আর কোনো ব্যথা থাকবে না।

দশ. কালো গোলাপের রাত

শেষ বিকেলের আলো যেমন ধীরে ধীরে অমাবস্যার আড়ালে হারিয়ে যায়, তেমনি লতার জীবনের শেষ আলোও নিভে আসছিল। ঠিক সেই সময় তার চোখ পড়ল প্রিয় গোলাপগাছটির দিকে। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন - একটি ফুল ফুটবে। সেই ফুলের গন্ধে হয়তো তার অন্ধকার জীবন এক মুহূর্তের জন্য আলো পাবে।

হঠাৎ লতার কণ্ঠ জেগে উঠল। “ওই তো আমার প্রিয় গাছে ফুল ফুটেছে! তোমরা আমাকে নিয়ে চলো ওর কাছে। আমি নয়ন ভরে দেখব, প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেব।”

কেউ সাড়া দিল না। লতার আহত হৃদয় ভেঙে চুরমার হতে লাগল। সে যেন শেষবারের মতো পৃথিবীকে ডাকল -

“তোমরা কোথায়? আমি চলে যাচ্ছি। যাওয়ার আগে শুধু একটি অনুরোধ রেখে যাই - আমি তো আমার ভালোবাসার ফুলটি স্পর্শ করে যেতে পারলাম না। আগামীকাল সূর্য ওঠার আগেই ফুলটি ছিঁড়ে আমার সাগরকে দিও। চাঁদনী রাতের স্নিগ্ধতার মতো সে যেন সাগরের জীবন আলোকিত করে রাখে।”

সেই রাতেই সাগর অদ্ভুত এক ডাক শুনল। আধোঘুমে মনে হলো - এ লতার কণ্ঠ। এত রাতে লতা তাকে কেন ডাকছে? তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে যেন শুনতে পেল লতার আকুল আবেদন। মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর ঝড় উঠল। এক বছর আগের সেই লতা - যার জন্য তার হৃদয় একসময় ছটফট করত - সব স্মৃতি নিয়ে ফিরে এল।

“আমি আসছি, লতা - আমি আসছি।”

চাঁদনী রাতের নরম আলোয় সাগর ছুটে গেল লতার কাছে। লতার পরিবারের সবাই তখন গভীর ঘুমে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে সাগর দেখল - লতার সমস্ত শরীর বিষণ্নতার ছায়ায় ঢেকে আছে। যে লতা একসময় সাগরকে এক পলক দেখতে শত বাধা পেরিয়ে ছুটে আসত, আজ সেই লতা তাকে কাছে পেয়েও উঠে বসতে পারছে না।

লতা কেবল হাতের ইশারায় জানালার পাশের গোলাপগাছটি দেখাল। তার চোখের কোণ বেয়ে নীরব অশ্রু ঝরছে। সাগর তাকিয়ে দেখল - সত্যিই এক অপূর্ব শোভায় ফুটে আছে একটি কালো গোলাপ; যেন রাতের বুক চিরে জন্ম নেওয়া এক টুকরো ব্যথার চাঁদ।

সাগর ফুলটি ছিঁড়ে এনে লতার সামনে ধরল। কিন্তু প্রিয় ফুলের গন্ধও আর সহ্য হলো না লতার। তার চোখে ধীরে ধীরে নিদ্রা নেমে এল। পৃথিবীর সব মায়া, সব অপেক্ষা, সব অনুরোধ পেছনে ফেলে সে চিরদিনের জন্য চলে গেল।

এগারো. ভালোবাসার অমর স্মৃতি

সাগর যেন বাস্তবতার বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গেল। কোন পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাকে এমনভাবে জাগিয়ে তুলল? সে পাগলের মতো “লতা, লতা” বলে চিৎকার করতে লাগল। ঘুম ভাঙল সবার, কিন্তু যার জন্য তার এই আর্তনাদ - সে আর কোনো উত্তর দিল না।

এক এক করে সাগরের মনে ফিরে এল সব স্মৃতি: ডায়েরির হারিয়ে যাওয়া পাতা, প্রথম দেখা, লতার মিষ্টি হাসি, কবিতার প্রশংসা, নদীর ঢেউ, বুকের মধ্যে জড়িয়ে তীরে ওঠা, আর সেই প্রশ্ন - “আমাকে তুমি কোনোদিন ভুলে যাবে না তো?”

সাগর এবার সত্যিই বুঝল, ভালোবাসা যখন স্পর্শের সীমা পেরিয়ে চলে যায়, তখন তার অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বড় উপস্থিতি হয়ে থাকে। মানুষ হারিয়ে যায়, কিন্তু তার স্মৃতি হারায় না। চোখের আড়াল হওয়া মানুষ হৃদয়ের মণিকোঠায় আরও গভীর হয়ে জেগে থাকে।

লতার কালো গোলাপ সেই রাতের পর আর শুধু একটি ফুল ছিল না; তা হয়ে গেল এক অসমাপ্ত ভালোবাসার প্রতীক। তার গন্ধে ছিল লতার অশ্রু, তার রঙে ছিল বিদায়ের অন্ধকার, আর তার নীরবতায় ছিল একটি সত্য - আবেগের পাখায় ভর করে কখনো বাস্তবতার সাগর পাড়ি দেওয়া যায় না।

তবু প্রথম ভালোবাসা মরে না। সে নীল আকাশের মতোই থেকে যায় - কখনো মেঘে ঢাকা, কখনো অশ্রুতে ভেজা, কখনো চাঁদের আলোয় নিরবধি। সাগরের জীবনে লতা নেই, কিন্তু লতার স্মৃতি আছে। আর সেই স্মৃতিই তার জীবনের গভীরতম কবিতা হয়ে রইল।

— সমাপ্ত —

02

“ভালোবাসি” বলা হলো না

একটি স্মৃতিনির্ভর আবেগঘন গল্প

শীতের সকাল, দীর্ঘ স্কুলপথ, ঝড়-বৃষ্টি, তালগাছের ছায়া এবং রক্তে লেখা অথচ না-পৌঁছানো চিঠির অব্যক্ত ভালোবাসা।

অব্যক্ত ভালোবাসাস্মৃতিবেদনাময়
📄 PDF পড়ুন⬇️ PDF Downloadসূচিতে যান

ভালোবাসি বলা হলো না

একটি স্মৃতিনির্ভর আবেগঘন গল্প

—
“কিছু কথা উচ্চারণ না করলেও হৃদয়ের গভীরে তারা আজীবন ধ্বনিত হতে থাকে।”

লেখক: লিয়াকত হোসেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

❦

প্রস্তাবনা: অব্যক্ত ভালোবাসার নীল সকাল

জীবনের কিছু স্মৃতি আছে, যেগুলো সময়ের ধুলোয় মুছে যায় না; বরং যত দিন যায়, ততই তারা বুকের ভেতর নতুন করে আলো-ছায়ার খেলা শুরু করে। প্রথম ভালোবাসা তেমনই এক স্মৃতি—যার কাছে যুক্তি হার মানে, বয়স থমকে দাঁড়ায়, আর হৃদয় ফিরে যায় সেই কিশোর বয়সের কুয়াশাভেজা সকালের কাছে।

এই গল্পটিও এমনই এক অব্যক্ত ভালোবাসার গল্প। এখানে আছে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ স্কুলপথ, শীতের কুয়াশা, ভোরের ঘুমভাঙা পাখির ডাক, এক মায়াবী কিশোরীর হাসি, ঝড়-বৃষ্টির এক আশ্রয়হীন বিকেল, আর আছে একটি চিঠি—যে চিঠি লেখা হয়েছিল হৃদয়ের রক্ত দিয়ে, কিন্তু পৌঁছাতে পারেনি প্রিয় মানুষের হাতে।

লাইজু নামের মেয়েটি হয়তো পৃথিবীর চোখে ছিল খুব সাধারণ; কিন্তু এক কিশোর হৃদয়ের কাছে সে ছিল ভোরের প্রথম আলো, বসন্তের প্রথম কোকিল, আর নীল আকাশে ভেসে থাকা এক বিন্দু মায়া।

এক. শীতের সকাল, স্কুলপথ ও প্রথম থমকে যাওয়া

তখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। শীতের দিনগুলোতে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিন শুরু করতে হতো। কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে মর্নিং ওয়ার্ক শেষে প্রস্তুতি নিতাম স্কুলে যাওয়ার। সময়মতো গাড়ি পাওয়া গেলে ভাগ্য ভালো, আর না পেলে সেই দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিতে হতো। কখনো কখনো গাড়ির অপেক্ষা করতে করতে এমনও হয়েছে—স্কুলে যাওয়াই আর সম্ভব হয়নি।

সেদিনও ঠিক তেমনই এক সকাল। গাড়ির অপেক্ষা করতে করতে শেষ পর্যন্ত আমি বাড়ির পথ ধরলাম। বাড়ির কাছেই ছিল নিম্ন মাধ্যমিক স্কুলটি; সেই স্কুলের করিডোর হয়েই আমাকে ফিরতে হতো। করিডোরে পা রাখতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম। মনে হলো, সময় যেন নিজের চলা ভুলে গেছে।

সামনে দাঁড়িয়ে ছিল লাইজু। আগেও তাকে বহুবার দেখেছি, কথা বলেছি, হাসি-ঠাট্টাও হয়েছে; কিন্তু সেদিনের দেখাটা ছিল অন্যরকম। তার চোখে যেন ভোরের শিশির জমেছিল, আর ঠোঁটের কোণে ছিল এমন এক মায়াবী হাসি, যা কিশোর হৃদয়কে বিনা অনুমতিতে বন্দি করে ফেলে।

সে চোখে চোখ রেখে বলল, ‘ভাইয়া, কেমন আছ?’ আমি হতভম্বের মতো শুধু বললাম, ‘ভালো।’ অথচ জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেলাম—তুমি কেমন আছ? সেই ভুলটুকু তখন ছোট মনে হলেও পরে বুঝেছি, কখনো কখনো জীবনের বড় আফসোস শুরু হয় এমন ছোট নীরবতা থেকেই।

লাইজু বলল, ‘ভাইয়া, তোমাদের স্কুলে কি আমার মতো ছাত্রীর জায়গা হবে?’ আমি হেসে বললাম, ‘না।’ সে বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’ আমি দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বললাম, ‘তোমার মতো সুন্দর, মায়াবী মেয়ের কোমল ঠোঁটের হাসি দেখার মতো সৌভাগ্যবান ছাত্র আমাদের স্কুলে নেই তো, তাই।’

সে লজ্জা আর হাসির মাঝামাঝি এক আলো মুখে মেখে বলল, ‘যাও, দুষ্টু কোথাকার! আমি বলি কী, আর তুমি বলো কী!’ তারপর ঠোঁটে হাসির পরশ রেখে বিদায় নিল। সেই বিদায়ের পর থেকেই মনে হলো, আমার ভেতরে কোনো অচেনা পাখি ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে।

দুই. হৃদয়ের জানালায় নতুন আলো

বাড়ি ফিরে মন আর স্থির থাকল না। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছিল তার মুখ, তার হাসি, আর সেই অর্ধেক বলা কথাগুলো। এতদিনের পরিচিত মেয়েটি হঠাৎ কেন এত আপন হয়ে উঠল, তার কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না। শুধু মনে হচ্ছিল—হৃদয়ের জানালায় কেউ একজন নীরবে এসে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদিনের মতো আরেক সকালে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ালাম। পাশেই ওদের বাড়ি। গাড়ি সময়মতো এল না, তাই হাঁটতে হাঁটতে স্কুলের পথে বের হলাম। এরই মধ্যে লাইজু আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়েছে। পথ চলতে চলতে বারবার মনে হতে লাগল—ওকে কি একটি চিঠি লিখব? মনের কথা কি জানাব? আবার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল অজানা ভয়—যদি সে না বোঝে, যদি ভুল বোঝে!

ভাবতে ভাবতে কখন স্কুলের করিডোরে এসে দাঁড়িয়েছি, নিজেই টের পাইনি। সামনে তাকাতেই দেখলাম, ক্লাসরুমের দরজার পাশে এক অপূর্ব ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে লাইজু। আকাশ তখন রৌদ্রোজ্জ্বল, উত্তরের বাতাসে শীতের মৃদু স্পর্শ। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। মনে হলো, গোলাপের সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে বেলি ফুলের মিষ্টি সুবাস আমার দিকে ভেসে আসছে।

সেদিনের ক্লাস চলল যথারীতি। কিন্তু মন ক্লাসে ছিল না। অক্ষরগুলো চোখের সামনে এলেও অর্থ হারিয়ে ফেলছিল। মনে হচ্ছিল, লাইজুর একটি হাসিই যেন আমার সারাদিনের পাঠ্যবই।

তিন. ঝড়ের বিকেল, তালগাছের ছায়া

বিকেলের দিকে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ল। হঠাৎ চোখ পড়ল উত্তর আকাশে—কালো মেঘের ভেলা পাহাড়ের মতো জমে উঠছে। মুহূর্তে চারদিক অন্ধকার হয়ে এল, সূর্যটিও লুকিয়ে গেল মেঘের আড়ালে। কনকনে শীতের সঙ্গে ঝড়ের আভাস মিলে স্কুল ছুটি হয়ে গেল। সবাই ছুটল আপন ঘরের দিকে।

বাঁ দিকে তাকাতেই দেখি লাইজু আমার পাশে। আমি বললাম, ‘তাড়াতাড়ি চলো।’ পুরো বিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর মধ্যে আমাদের দুজনের পথই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ। আমরা হাঁটতে লাগলাম দ্রুত পায়ে—নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর তাড়নায়, অথচ বুকের ভেতর অকারণ কাঁপুনি নিয়ে।

মাইলখানেক পথ বাকি থাকতে আকাশ যেন হঠাৎ খুলে গেল। প্রথমে বড় বড় ফোঁটা, তারপর প্রবল বৃষ্টি। লাইজু আমার গা ঘেঁষে হাঁটছিল। বুঝতে পারলাম, তার ভেতরে ভয় জমছে। একটু পর একটি তালগাছের নিচে এসে সে বলল, ‘ভাইয়া, এই গাছটার নিচে একটু দাঁড়াই না? কাছে তো কোনো বাড়িঘর নেই।’

অন্য কোনো উপায় ছিল না। তার স্কুলব্যাগটি আমার কাছে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম শিলাবৃষ্টির বিপরীতে। হঠাৎ মেঘের প্রচণ্ড গর্জনে লাইজু ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি তাকে সাহস দিতে চাইলাম, কিন্তু নিজেই যেন কেঁপে উঠলাম সেই মুহূর্তের গভীরতায়।

তার ভেজা কাঁধ, শীতের কাঁপুনি আর ভয়ভরা নিঃশ্বাসের শব্দ আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত মমতা জাগিয়ে তুলল। কোনো উচ্ছৃঙ্খল আবেগ নয়—বরং এক অদ্ভুত দায়িত্ববোধ, যেন পৃথিবীর সব ঝড় থেকে তাকে আগলে রাখাই আমার একমাত্র কাজ। আমি তাকে বুকের কাছে টেনে বললাম, ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’

মনে হলো, আমার বুকে মাথা রেখে সে যেন কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল। বৃষ্টি তখনও ঝরছে, কিন্তু সেই বৃষ্টির ভেতর আমরা দুজন যেন পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম।

চার. যে কথা বলা হলো না

আমি গভীর স্নেহে ডাকলাম, ‘লাইজু, এই লাইজু!’ আমার ডাকে সে মাথা তুলে তাকাল। সেই চোখে ভয় ছিল, লজ্জা ছিল, আর ছিল এমন এক অচেনা আকুলতা, যার ভাষা কোনো অভিধানে লেখা থাকে না। সে তখনও শক্ত করে আমার হাত ধরে রেখেছে।

আবার ডাকতেই সে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যেও আমার চোখের আবেগমাখা হাসি দেখে তার ফ্যাকাশে মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। কাঁপা ঠোঁটে, লাজুক চোখে সে বলল, ‘ভাইয়া, এমন করেই আমায় ধরে রেখো যতদিন থাকব এই পৃথিবীতে। রাখবে না?’

কথাটি শুনে আমার বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। এই কি সেই অব্যক্ত ভালোবাসা, যার জন্য এতদিন হৃদয় অপেক্ষা করছিল? উত্তর দিতে চাইলাম—‘হ্যাঁ, রাখব।’ কিন্তু শব্দগুলো গলায় এসে আটকে গেল। না বলতে পারলাম, না হ্যাঁ বলতে পারলাম। শুধু তার মাথাটি আরও কাছে টেনে নিলাম বুকের মধ্যে।

কিছু নীরবতা শব্দের চেয়েও বেশি সত্য। কিন্তু সে নীরবতা কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যথা হয়ে ফিরে আসে। সেদিন আমি যদি শুধু একটি শব্দ বলতাম—‘ভালোবাসি’—তবে হয়তো আমার বুকের ইতিহাস অন্যরকম হতো।

পাঁচ. বৃষ্টিভেজা পথ ও রক্তে লেখা চিঠি

আমাদের দুজনের শরীর প্রায় ভিজে গেছে। মাঘের হিমেল বাতাস আর প্রবল বৃষ্টির দাপটে ঠোঁট পর্যন্ত কাঁপছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর বৃষ্টি কিছুটা কমল, কিন্তু বাতাস তখনও তীব্র। হঠাৎ একটি রেইনট্রি গাছের অর্ধেক ভেঙে এসে প্রচণ্ড শব্দে আঘাত করল পাশের তালগাছে। লাইজু ‘মাগো’ বলে চিৎকার করে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

বুঝলাম, আর দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়। ঝড়ের মধ্যেই আমরা বাড়ির পথে ছুটলাম। লাইজুর শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে আসছিল; সে নিঃশব্দে আমার কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতে লাগল। পিচ্ছিল পথে কয়েকবার পড়ে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আমি ফিরলাম নিজের ঘরে।

সেই রাতটি আর ঘুমের ছিল না। বারবার মনে পড়ছিল বৃষ্টিভেজা মুহূর্তগুলো, তালগাছের নিচে তার কাঁপা চোখ, আর সেই প্রশ্ন—‘রাখবে না?’ বুকের ভেতর অনুতাপের আগুন জ্বলতে লাগল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক তাকে জানাব—আমি তাকে ভালোবাসি, আজীবন ধরে রাখতে চাই।

অর্ধেক রাত জেগে একটি চিঠি লিখলাম। ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তাই হৃদয়ের ভেতর থেকে শব্দ তুললাম। এমনকি আবেগের তাড়নায় আঙুল কেটে রক্তের দাগও রেখে দিলাম চিঠির কোণে—কিশোর বয়সের সরল, বেপরোয়া, অথচ অগাধ ভালোবাসার অদ্ভুত সাক্ষী হয়ে।

ভোর হলে দরজা খুলে বাইরে এলাম। পূর্ব আকাশে আলো ফুটছে, মেঘের আড়াল থেকে দিনের প্রথম সোনালি রেখা উঁকি দিচ্ছে। মনে মনে বললাম—আজই তাকে জানাব, আমার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ সে-ই।

ছয়. অসুস্থতার শয্যা ও অপ্রকাশিত চিঠি

রক্তে লেখা চিঠিটি পকেটে নিয়ে স্কুলের পথে বের হলাম। বাসস্ট্যান্ডে লাইজুকে না দেখে ভাবলাম, হয়তো আগেই চলে গেছে। কিন্তু স্কুলে গিয়ে জানলাম, সে আজ আসেনি। বুকের ভেতর হঠাৎ এক অস্বস্তি জেগে উঠল। বাড়ি ফিরে শুনলাম—লাইজুর প্রচণ্ড জ্বর। আমি আর অপেক্ষা করতে পারলাম না, ছুটে গেলাম ওদের বাড়ি।

দরজায় পা রাখতেই চোখে পড়ল—খাটের ওপর নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে লাইজু। যে মুখ একদিন বৃষ্টির ভেতর লজ্জায় লাল হয়েছিল, আজ তা জ্বরের আঁচে ফ্যাকাশে। ঘরে প্রবেশ করেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওর কী অবস্থা?’ তার মা অশ্রুসজল চোখে বললেন, ‘একই অবস্থা। গত রাত থেকে জ্বর। ডাক্তার আনা হয়েছিল, কিন্তু তেমন কাজ হয়নি।’

আমি সান্ত্বনার কথা বলার চেষ্টা করলাম। তার কপালে হাত রাখতেই লাইজু ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকাল। কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু তার দুই চোখ বেয়ে নেমে এল পাহাড়ের নীরব কান্নার মতো অশ্রু। সেই চোখে আমি যেন দেখলাম—একটি অব্যক্ত ভালোবাসার শূন্য গ্যালারি, যেখানে কেউ কোনোদিন হাততালি দেয়নি, শুধু অপেক্ষা জমে আছে।

শিয়রের পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই সে চোখ বন্ধ করল। মনে হলো, আমার হাতের স্পর্শে সে একটু শান্তি পেল। আমি বললাম, ‘ভালো থেকো। কাল সকালেই আসব।’ কিন্তু চিঠিটি আর দেওয়া হলো না। পকেটের ভেতর নিঃশব্দে রয়ে গেল আমার সমস্ত স্বীকারোক্তি।

সাত. স্বপ্নের ভিতর একটি মৃত্যুর পূর্বাভাস

সেই রাতটিও কেটে গেল তার ভাবনায়। শেষ প্রহরে চোখে ঘুম নেমে এলো। স্বপ্নে দেখলাম—একগুচ্ছ রজনীগন্ধা আর চিঠি হাতে আমি দাঁড়িয়ে আছি। লাইজু সুস্থ হয়ে আমার সামনে এসেছে। আমি তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালাম, তারপর চিঠিটি তার হাতে দিয়ে বললাম আমার অব্যক্ত ভালোবাসার কথা।

সব শুনে সে হঠাৎ হাসতে হাসতে মাটিতে পড়ে গেল। মুহূর্তে তার মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল। আমি ডাক্তার আনতে ছুটলাম। পথে বিশাল এক সাপ আমাকে তাড়া করল। ভয়ে ঘরে ফিরে এসে দেখি—লাইজু আর নেই; পৃথিবীর সমস্ত মায়া ছেড়ে সে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে।

স্বপ্নের সেই করুণ দৃশ্য দেখে ‘লাইজু, লাইজু’ বলে চিৎকার করতেই ঘুম ভেঙে গেল। বুক ধড়ফড় করছে, শরীর কাঁপছে। মা ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে?’ আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু নিজেকে বোঝাতে লাগলাম—স্বপ্ন তো স্বপ্নই, সত্যি নয়। অথচ ভোরের আকাশ সেদিন অকারণ ভারী লাগছিল।

আট. শেষ সংবাদ

সেদিন ভোরের পাখির ডাকেও আর মন জাগল না। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যও যেন চোখে ধরা দিল না। বিষণ্ণ মনে বাইরে আসতেই দেখি লাইজুর ছোট ভাই আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তার মুখের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী খবর, নুরুল?’

সে কোনো উত্তর দিল না; শুধু কাঁদতে লাগল। তার কান্না দেখে মনে হলো, এই পাষাণ পৃথিবী হয়তো সত্যিই ধরে রাখতে পারেনি আমার লাইজুকে। তবু হৃদয় বিশ্বাস করতে চাইছিল না। কারণ ‘ভালোবাসি’—এই কথাটি তো এখনও বলা হয়নি!

আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। ছুটে গেলাম তাদের বাড়ির দিকে। বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই শুনলাম করুণ সুরের কান্না। তখন আর বুঝতে বাকি রইল না—আমার জীবনের সবচেয়ে মায়াবী সকালটি অন্ধকার হয়ে গেছে। লাইজু চলে গেছে। যে পৃথিবীতে তাকে ধরে রাখার জন্য আমি একদিন কোনো উত্তর দিতে পারিনি, সেই পৃথিবীও তাকে ধরে রাখতে পারল না।

আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, বুকের ভেতর কেউ যেন নীরবে একটি দরজা বন্ধ করে দিল। পকেটে তখনও সেই চিঠি—অপ্রকাশিত, অপঠিত, অমর।

নয়. সমাধির পাশে অব্যক্ত স্বীকারোক্তি

ব্যথাভরা হৃদয়ে, চোখের জলে ভেজা তিন মুঠো মাটি রাখলাম তার সমাধিতে। যে হাতে একদিন তাকে আশ্বাস দিতে পারিনি, সেই হাতই আজ তার বিদায়ের মাটিতে কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি মুঠো মাটির সঙ্গে আমার বুকের ভেতর থেকে একেকটি স্বপ্ন ঝরে পড়ছে।

সেই দিন থেকে আজও, যখনই তার সমাধির পাশে দাঁড়াই, মনে হয়—লাইজু হয়তো বাতাসের ভেতর কোথাও আছে। হয়তো সে শুনছে আমার অব্যক্ত স্বীকারোক্তি। হয়তো সে জানে, আমি তাকে বলতে পারিনি, কিন্তু ভালোবাসিনি তা নয়।

কবরের নীরব মাটির কাছে দাঁড়িয়ে আজও করুণ সুরে বলে যাই—

‘হয়তো কোনো একদিন শুকিয়ে যাবে নীল সাগরের পানি,

কোনোদিন ভাবিনি লাইজু, তুমি হবে এমন পাষাণী।’

আসলে সে পাষাণী ছিল না। পাষাণ ছিল সময়, পাষাণ ছিল আমার নীরবতা। একটি শব্দের অভাবে যে ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি, সেটিই আজ আমার জীবনের দীর্ঘতম কবিতা হয়ে বেঁচে আছে। ভালোবাসা কখনো কখনো বলা হয় না; কিন্তু না-বলা ভালোবাসাই কখনো কখনো হৃদয়ের গভীরে সবচেয়ে বেশি জেগে থাকে।

উপসংহার: যে কথার কোনো মৃত্যু নেই

প্রথম ভালোবাসা সবসময় মিলনের গল্প নয়; কখনো সে হয়ে ওঠে না-বলা কথার স্মৃতি, না-পৌঁছানো চিঠির দীর্ঘশ্বাস, আর ভেজা মাটির ওপর রেখে আসা তিন মুঠো ভালোবাসা। লাইজু চলে গেছে, কিন্তু তার হাসি যায়নি। তার সেই ভেজা বিকেলের চোখ, তার কাঁপা কণ্ঠের অনুরোধ, আর আমার পকেটে অপ্রেরিত চিঠি—সব মিলিয়ে সে আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছে।

সময়ের স্রোত অনেক দূর নিয়ে যায় মানুষকে, কিন্তু কিছু নাম হৃদয়ের পাড় ছেড়ে যায় না। লাইজু সেই নাম—যাকে ভালোবাসি বলা হলো না, অথচ যার জন্য ভালোবাসা আজও শব্দহীনভাবে জ্বলে আছে।

— সমাপ্ত —

03

ভালোবাসার পরিণাম

সাহিত্যিক উপস্থাপনায় আবেগঘন ও রোমান্টিক গল্প

মালা ও স্বপনের গল্প—প্রেম, প্রতারণা, সামাজিক চাপ, নারীর অসহায়তা এবং নীরব আত্মত্যাগের করুণ সামাজিক আখ্যান।

সামাজিক গল্পকরুণ প্রেমম্যাগাজিন
📄 PDF পড়ুন⬇️ PDF Downloadসূচিতে যান

সাহিত্যিক উপস্থাপনায় আবেগঘন ও রোমান্টিক গল্প

❧ ❧ ❧
“আবেগ নিকটের বন্ধু, দূর পাল্লার ধ্বংসলীলা।”

লেখক: এফ. এম. লিয়াকত হোসেন

এম.বি.এ. (হিসাব বিজ্ঞান), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

মালা ও স্বপনের গল্প

মূল ঘটনার ভাব ও বেদনাময় আবেগ অক্ষুণ্ণ রেখে ভাষা, গঠন, রোমান্টিকতা ও সাহিত্যরস আরও মসৃণভাবে সাজানো হয়েছে।

প্রেম যদি দায়িত্ব না শেখায়, তবে তার আলো খুব দ্রুত অন্ধকার হয়ে ওঠে।

প্রস্তাবনা: চাঁদ-তারা ও কাশফুলের সাক্ষী

ওই তো আকাশের সেই চাঁদ, সেই নীরব তারা—যারা একদিন গভীর রজনীর বুক জুড়ে আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল। ওই তো সেই নীলিমা, যে এক বিকেলে আবিরের সোনালি আভায় রঙধনুর সাত রঙ মেখে নিয়েছিল। আর ওই যে নদীপাড়ের কাশফুল—এলোমেলো বাতাসে মাথা নেড়ে যেন ডাকছিল এক নিষ্পাপ কিশোরীকে।

শ্রাবণের পড়ন্ত বিকেল। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। তার চোখে ছিল বিস্ময়, মুখে ছিল মাটির গন্ধমাখা সরলতা, আর বুকের ভেতর ছিল অজস্র না-বলা স্বপ্ন। সেই মেয়েটির নাম মালা। তার জীবন ছিল দুঃখের তিমিরে পোড়া, তবু তার অন্তরে জ্বলছিল শিক্ষার আলো—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

মালার জীবনকথা লিখতে গেলে হয়তো এক দীর্ঘ মহাকাব্য হয়ে যাবে। তাই সব নয়—তার জীবনের ক্লান্ত লগ্নের, তার প্রেমের, তার ভাঙনের এবং তার নীরব প্রতিবাদের কিছু কথা এখানে সাজিয়ে বলা হলো। কারণ কিছু গল্প কেবল গল্প নয়; কিছু গল্প মানুষের বিবেকের দরজায় নীরবে কড়া নাড়ে।

❧ ❧ ❧

এক. স্বপ্নের দিকে হাঁটা একটি মেয়ে

গ্রামবাংলার সহজ-সরল, দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম মালার। সংসারে অভাব ছিল, অনটন ছিল, ছিল বাবা-মায়ের অশিক্ষার অন্ধকারও। কিন্তু মালার ভেতর ছিল এক আশ্চর্য আলো। সে বিশ্বাস করত—শিক্ষাই তাকে একদিন নিজের পায়ের নিচে শক্ত মাটি দেবে।

প্রথমে বাবা-মায়ের অজান্তেই সে স্কুলে যাওয়া শুরু করে। পথ ছিল দীর্ঘ, ক্লান্তিকর; কিন্তু মন ছিল দৃঢ়। প্রখর স্মৃতিশক্তি আর মেধার জোরে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে সে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। গ্রামে যখন মালার সাফল্যের কথা ছড়িয়ে পড়ল, তখন তার বাবা-মাও ধীরে ধীরে বুঝলেন—এই মেয়ের চোখে শুধু স্বপ্ন নেই, স্বপ্ন পূরণের শক্তিও আছে।

চেহারায়, ব্যবহারে, পড়াশোনায়—মালা যেন নিজেকে আলাদা করে তুলেছিল। কেউ তাকে দরিদ্র ঘরের মেয়ে বলে চিনতে পারত না; বরং তার আত্মমর্যাদা, সৌন্দর্য আর সরল ব্যক্তিত্ব অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। কিন্তু মালা ছিল মাটির মতো নম্র, আর পাথরের মতো স্থির। সহজে কারও প্রশংসায় গলে যাওয়ার মেয়ে সে নয়।

দুই. স্বপনের আগমন

একদিন সত্যিই স্বপন নামের এক তরুণের চোখ এসে থেমে গেল মালার দিকে। স্বপন ছিল বাবা-মায়ের আদরের একমাত্র ছেলে; সদ্য এইচএসসি পাস করেছে। বয়সে তরুণ, চেহারায় সুদর্শন, কথায় ভদ্রতা—তবু মালার কাছে প্রথম দিনের প্রস্তাব কোনো গুরুত্বই পেল না।

মালা তাকে বড় ভাইয়ের মতোই সম্মান করত। স্বপন একদিন একটি নীল খাম এগিয়ে দিয়েছিল; মালা তা গ্রহণ করেনি। সেই নীল খামের ভাঁজে হয়তো ছিল অস্থির হৃদয়ের কথা, কিন্তু মালার হৃদয় তখনও পড়াশোনার পথে নিবিষ্ট।

তবু মানুষ যতই নিজেকে কঠিন করে রাখুক, কারও আন্তরিক আচরণ কখনো কখনো মনে নরম ছায়া ফেলে। স্বপনের বিনয়, তার অপেক্ষা, তার অপ্রকাশিত ব্যাকুলতা—দিনে দিনে মালার ভাবনাকে স্পর্শ করতে লাগল। সে নিজেও বুঝতে পারল না, কখন একটি নাম তার মনের দরজায় এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে গেছে।

তিন. পড়ার টেবিল থেকে হৃদয়ের পাঠ

মালার টেস্ট পরীক্ষার আর মাত্র দুই মাস বাকি। পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যাওয়া, প্রাইভেট পড়া—সব মিলিয়ে তার জন্য সময় ও শরীর দুটোই ক্লান্ত হয়ে উঠছিল। একদিন সে সংকোচ ছাড়াই স্বপনকে বিষয়টি জানাল।

স্বপনের মনে যেন হঠাৎ আশার একটি আলো জ্বলে উঠল। সে বলল, ‘তুমি চাইলে এই দুমাস আমি তোমাকে পড়াতে পারি। আমার কলেজও এখন বন্ধ।’ মালা রাজি হলো। পরদিন থেকেই সে স্বপনের কাছে পড়তে যেতে লাগল।

কিন্তু পড়ার টেবিল কখন যে ধীরে ধীরে হৃদয়ের পাঠশালায় রূপ নিল, কেউ টের পেল না। স্বপন বুঝত—মালা তাকে বিশ্বাস করে এসেছে, এখন সে তার ছাত্রীও। তাই বিবেক বারবার তাকে থামাত। অথচ অদম্য আবেগ তার ভেতরে তরঙ্গ তুলত। কিছু কথা আছে, না বললে বুকের ভেতর নদী হয়ে বাজে; স্বপনের সেই নদীও একদিন বাঁধ মানল না।

চার. বলা না-বলা কথার কম্পন

এক বিকেলে মালা পড়তে আসতেই স্বপন বলল, ‘মালা, আজ তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। শুনবে?’

মালা মৃদু হেসে বলল, ‘কেন শুনব না? রোজই তো আপনার কথা শুনি। আজ আবার এমন কী কথা যে আগে অনুমতি নিতে হচ্ছে?’ হাসির সেই মুহূর্তে তার ঠোঁটের কোণে যেন কাশফুলের নরম আলো ফুটে উঠল।

স্বপনের সাজানো কথাগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। সে বলল, ‘আজ নয়, কাল বলব।’ কিন্তু মালার নীরবতা যেন বুঝিয়ে দিল—সে কথাটির অপেক্ষায় থাকবে।

পরদিন মালা এসেই জানতে চাইল সেই না-বলা কথাটি। স্বপন তার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, ‘মালা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। খুব গভীরভাবে ভালোবাসি।’

মালা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেল না। বুকের ভেতর কাঁপন উঠল, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ এল না। সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে এসে সে বুঝল—রাগ নয়, ভয় নয়; তার ভেতর অন্য এক অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে।

❧ ❧ ❧

পাঁচ. প্রথম ভালোবাসার নীল খাম

রাতের অর্ধেক কেটে গেল স্বপনের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে। মালা বুঝল, বরফ যত কঠিনই হোক, সূর্যের স্পর্শে একদিন গলতেই হয়। মেয়েদের মন কখনো পাথর, কখনো আবার ভালোবাসার পূজারী—মালাও তার ব্যতিক্রম নয়।

পরদিন লজ্জায় গাল দুটি লাল করে সে স্বপনের ঘরে ঢুকল। স্বপন ভেবেছিল মালা হয়তো তার কথায় কষ্ট পেয়েছে। সে মাথা নিচু করে বলল, ‘যদি তোমার কষ্ট হয়ে থাকে, আমাকে ক্ষমা করে দিও। তুমি না চাইলে আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করব না।’

মালা তখন স্বপনের হাত দুটো আলতো করে ধরল। তার কণ্ঠ কাঁপছিল, অথচ কথাগুলো ছিল স্পষ্ট—‘স্বপন, আমিও তোমাকে ভালোবাসি।’

সেই মুহূর্তে ঘরের নিস্তব্ধতা যেন ফুলের গন্ধে ভরে উঠল। দুজনের চোখে চোখ পড়ল, তারপর আবার নেমে গেল লজ্জায়। কোনো বড় শপথ ছিল না, কোনো আড়ম্বর ছিল না; ছিল শুধু দুটি কাঁচা হৃদয়ের বিশ্বাস, আর প্রথম ভালোবাসার নির্মল কম্পন।

এরপর মালার মনের জানালার চারপাশে ভালোবাসার প্রজাপতি রঙিন পাখা মেলে উড়তে লাগল। সে নীল খামের ভাঁজে ভাঁজে লিখে ফেলল প্রথম ভালোবাসার অনুভূতি। অক্ষরগুলো ছিল কিশোরী হৃদয়ের কাঁপা-কাঁপা স্বীকারোক্তি—সেখানে ছিল অপেক্ষা, লজ্জা, আনন্দ, ভয় আর এক অদ্ভুত মধুর অস্থিরতা।

ছয়. ফুল, বৃষ্টি ও আবেগের অন্ধকার

পরদিন মালা স্বপনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাতে একটি ফুল। স্বপন ফুলটি গ্রহণ করতেই মালার চোখে এমন এক আলো দেখা দিল, যেন সে নিজের হৃদয়েরই একটি পাপড়ি তুলে দিয়েছে। স্বপন সেই ফুলকে শুধু ফুল হিসেবে নেয়নি; নিয়েছিল মালার প্রথম প্রেমের নীরব প্রতীক হিসেবে।

ধীরে ধীরে তারা এক সুতোয় গাঁথা দুটি মনে পরিণত হলো। সময়মতো দেখা না হলে অস্থিরতা বাড়ত, কথা না বললে দিন অসম্পূর্ণ মনে হতো। মালা বুঝল—সঙ্গহীন জীবন সত্যিই কখনো কখনো হতাশার কাফন জড়ানো জীবন্ত লাশের মতো।

কিন্তু ভালোবাসা যার হৃদয়দুয়ারে উঁকি দেয়, তার মন আর সহজে পড়ার টেবিলে বসে থাকে না। মালার টেস্ট পরীক্ষার ফল আশানুরূপ হলো না। শিক্ষকরা তাকে সাবধান করলেন—সামনে এসএসসি পরীক্ষা। মালা চেষ্টা করল, কিন্তু মন বারবার স্বপনের কাছে উড়ে গেল।

এক সন্ধ্যায় কাজের অজুহাতে মালা স্বপনদের বাড়িতে এল। হঠাৎ কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল, প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। মেঘের গর্জনে ভয়ে মালা স্বপনের কাছে আশ্রয় নিল। স্বপন তাকে সাহস দিল, কিন্তু সেই বৃষ্টির রাত, সেই হৃদয়ের অস্থিরতা, সেই একান্ত নির্জনতা—সব মিলিয়ে আবেগ তাদের বিবেককে ঝাপসা করে দিল।

ভালোবাসার মুহূর্ত যদি দায়িত্বের আলোয় না দাঁড়ায়, তবে সেই মুহূর্তই কখনো কখনো জীবনের দীর্ঘতম অন্ধকার হয়ে ফিরে আসে। সেদিনও হয়তো তারা বুঝতে পারেনি—আবেগ নিকটের বন্ধু হলেও দূরপাল্লার পথে সে অনেক সময় ধ্বংসের বার্তা বয়ে আনে।

সাত. সমাজের চোখ, পরিবারের সিদ্ধান্ত

কথা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না। এক কান থেকে দুই কান, দুই কান থেকে চারদিকে—স্বপনের ঘরে মালার অবস্থানের খবর গ্রামজুড়ে ফিসফাস হয়ে উঠল। যারা এতদিন অপেক্ষা করছিল মালার বাবার মুখে চুনকালি দেওয়ার সুযোগের, তারা যেন এবার সুযোগ পেয়ে গেল।

অপমান, কটূক্তি আর কানাকানিতে যখন চারপাশ ভারী হয়ে উঠল, মালার বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন—মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেবেন। খবরটি মালার কাছেও পৌঁছল। কিন্তু মালা জানত, তার হৃদয় তো ইতিমধ্যে স্বপনের কাছে অর্পিত। সে মাকে সব খুলে বলল।

মালার মা মেয়ের কষ্ট দেখে ছুটে গেলেন স্বপনের বাবা-মায়ের কাছে। কিন্তু সেখান থেকে তিনি ফিরলেন অপমানের ভার বুকে নিয়ে। স্বপনের পরিবার এই সম্পর্ক মানতে রাজি হলো না।

সেদিন থেকে মালার পড়াশোনা প্রায় বন্ধ। স্বপনের সঙ্গে দেখা নেই প্রায় দুই সপ্তাহ। সে চিঠিতে সব জানাল। স্বপন বিয়ের কথা শুনে চমকে উঠল, কিন্তু সত্যিকারের প্রেমের পরিণতি যে দায়িত্বের মাধ্যমে সম্মান পায়—সে কথা সে যেন কখনো ভেবেই দেখেনি।

❧ ❧ ❧

আট. শেষ দেখা, ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস

মালার বাবার পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হয়ে গেল। অথচ মালার পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কেউ প্রশ্ন করল না। সে যেন নিজের জীবনেই পরবাসী হয়ে গেল। স্বপনের সঙ্গে শেষবার দেখা করার জন্য এক রাতের অন্ধকারে সে তার বাড়িতে গেল, কিন্তু স্বপনকে পেল না।

জানতে পারল, স্বপনকে দূরের এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিয়ের আর মাত্র একদিন বাকি। এক বান্ধবীর সাহায্যে মালা শেষবারের মতো স্বপনের দেখা পেল।

কিন্তু স্বপন তাকে দেখে না-চেনার ভান করল। যে চোখে একদিন ভালোবাসার আলো ছিল, আজ সেখানে ছিল ভয়ের কুয়াশা, দায় এড়ানোর কঠিন মুখোশ। মালা বারবার অনুরোধ করল—‘আমার কথা একবার শুনো।’

স্বপন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তখন মালা কাঁপা কণ্ঠে জানাল—তার ভেতরে স্বপনেরই একটি অনাগত জীবন স্পন্দিত হচ্ছে। সে বলল, ‘তুমি যদি তাকে স্বীকৃতি না দাও, আমি আর বাঁচতে পারব না। আমি কাউকে ঠকিয়ে অন্য ঘরে যেতে পারব না।’

কিন্তু মালার শত মিনতিও স্বপন নামের পাথর হৃদয়কে গলাতে পারল না। সে মালাকে ফিরিয়ে দিল। এক বুক অপমান, ভয় আর অসহায়তা নিয়ে মালা ফিরে এল নিজের বাড়িতে।

নয়. কালো ভোরের আগে

মালা কাউকে আর কিছু বলল না। কারণ সে ভাবল—সব জানাজানি হলে বাবা-মা সমাজে মুখ দেখাতে পারবেন না। যার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে, সেই নিরপরাধ মানুষটির জীবনেও কলঙ্কের দাগ পড়বে। নিজেকে সে চারদিক থেকে বন্ধ দরজার ভেতর আটকা দেখতে পেল।

সে বুঝল, এই পাথর-হৃদয়ের পৃথিবীতে তার ভালোবাসা, তার বিশ্বাস, তার স্বপ্ন—সবকিছু যেন একে একে ভেঙে গেছে। স্বপন তার প্রেমের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, কিন্তু মালা নিজেকে প্রতারক বানাতে চাইল না।

বিয়েবাড়িতে তখন বরযাত্রীরা এসেছে। কেউ আপ্যায়নে ব্যস্ত, কেউ গহনা গোছাচ্ছে, কেউ ভোরের বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাত গাঢ় হলে অনেকেই ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু মালার চোখে ঘুম ছিল না; তার ভেতরে চলছিল এক প্রচণ্ড ঝড়।

ভোর হওয়ার আগেই বাড়িতে হঠাৎ অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে—মালাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এ বাড়ি, ও বাড়ি, উঠোন, পুকুরপাড়—সব জায়গায় খোঁজ চলল। তারপর এক অন্ধকার ভোরে গ্রামবাসী স্তব্ধ হয়ে বুঝল—ভালোবাসার নিষ্ঠুর প্রতিদানে আঘাতপ্রাপ্ত মালা এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছে।

এই বিদায় কোনো মহিমা নয়, কোনো সমাধান নয়; এ ছিল এক অসহায় কিশোরী হৃদয়ের ভয়াবহ পরাজয়, সমাজের নীরব নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক বেদনাময় প্রশ্ন। মালার জীবন যেন বলে গেল—ভালোবাসা যদি দায়িত্ব না শেখায়, তবে তা কেবল ধ্বংস ডেকে আনে।

দশ. ভালোবাসার পরিণাম

মালার গল্প শেষ হলেও প্রশ্ন শেষ হলো না। যে স্বপন একদিন প্রেমের নামে ফুল নিয়েছিল, নীল খামে ভালোবাসা পড়েছিল, সেই স্বপনই দায়িত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পাথর হয়ে গেল। প্রেম তখন আর প্রেম থাকল না; হয়ে গেল প্রতারণা।

ভালোবাসা এক বিন্দু শিশির নয়, যে সামান্য বাতাসে শুকিয়ে যাবে। ভালোবাসা আকাশের উদারতা, সাগরের গভীরতা, মানুষের প্রতি মানুষের সর্বোচ্চ দায়বোধ। সেখানে কেবল আবেগ থাকলে চলে না; থাকতে হয় সম্মান, সাহস, দায়িত্ব এবং সত্যের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি।

মালা তার কিশোরী হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছিল। তার ভালোবাসায় ছিল আকাশের মতো বিস্তার, নদীর মতো স্বচ্ছতা, আর ফুলের মতো কোমলতা। কিন্তু সেই ভালোবাসার বিনিময়ে সে পেয়েছিল সামাজিক অপমান, পারিবারিক চাপ, এবং প্রিয় মানুষের নির্দয় অস্বীকার।

এই গল্প তাই কেবল মালা ও স্বপনের নয়; এটি প্রতিটি হৃদয়ের জন্য সতর্কবার্তা। যারা ভালোবাসার নামে বিশ্বাস ভাঙে, তাদের কপালে ইতিহাস কালির দাগ এঁকে রাখে। আর যারা আবেগের ঘোরে জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়, তাদের গল্প আমাদের শেখায়—জীবনকে ভালোবাসার চেয়েও বড় করে দেখতে শিখতে হবে।

ভালোবাসার পরিণাম যেন কখনো মালার মতো না হয়। ভালোবাসা যেন হয় আশ্রয়, ধ্বংস নয়; আলো, অন্ধকার নয়; দায়িত্বের হাত, পালিয়ে যাওয়ার পথ নয়। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কাউকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় না—সে মানুষকে বাঁচতে শেখায়।

❧ ❧ ❧

— সমাপ্ত —

04

কলেজে প্রথম দিন

খোয়াজপুরের দরজায় নতুন আকাশ

১৯৯৯ সালে এস এস সি ফলাফলের তিন মাস পরে সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুরে প্রথম দিনের স্মৃতিময় গল্প।

তারুণ্যস্মৃতিক্যাম্পাস
📄 PDF পড়ুন⬇️ PDF Downloadসূচিতে যান

সময়: ১৯৯৯; এস এস সি পরীক্ষার রেজাল্টের প্রায় তিন মাস পর।

স্থান: সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর, মাদারীপুর।

খোয়াজপুরের দরজায় নতুন আকাশ

গল্প বিভাগ | বিশ্ববিদ্যালয়/ম্যাগাজিন সংস্করণ | সময়: ১৯৯৯

━━━━━━ ✦ ━━━━━━

লেখক: লিয়াকত হোসেন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রস্তাবনা: স্মৃতির দরজা

সময়টা ১৯৯৯। এস এস সি পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের প্রায় তিন মাস পরে, মাদারীপুরের খোয়াজপুরে অবস্থিত সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের দরজায় দাঁড়িয়ে আমি প্রথমবার বুঝেছিলাম—জীবনে কিছু দিন শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, তারা মানুষের ভেতরে নতুন বয়সের দরজা খুলে দেয়।

কালের স্রোতে অনেক দিন হারিয়ে যায়, কিন্তু সব দিন একরকম হারায় না। কিছু দিন ডুবে যায় নদীর তলদেশে, তবু জলের ওপর আলো পড়লেই তাদের রেখা দেখা যায়। মানুষের জীবনও তেমন—হাজার ব্যস্ততার ভিড়ে কিছু স্মৃতি চুপচাপ বুকের ভেতর বসে থাকে, সুযোগ পেলেই দরজা খুলে দেয়।

আমার জীবনে ‘কলেজে প্রথম দিন’ সেইরকম একটি দরজা। দরজাটি খুললেই একদিকে দেখা যায় শৈশবের উঠোন, মায়ের কোলে থাকা নিশ্চিন্ত দিন, স্কুলের করিডোরে প্রথম পা ফেলার কাঁপুনি; অন্যদিকে দেখা যায় নতুন এক পৃথিবী—যেখানে আমি আর শুধু স্কুলের ছেলে নই, আমি ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা এক মানুষ।

সেদিনের সকালটি আজও মনে হলে মনে হয়, একটি সাদা খাতা আমার সামনে খুলে দেওয়া হয়েছিল। তাতে কী লিখব জানতাম না; শুধু জানতাম, প্রথম অক্ষরটি ভুল হলে পুরো গল্পের ভঙ্গি বদলে যেতে পারে।

১. অপেক্ষার রাত

এস এস সি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর তিন মাস কেটে গেলেও আমার বুকের ভেতর ফলাফলের উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। তার ওপর যখন সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজে ভর্তি হওয়ার খবরটি নিশ্চিত হলো, দিনগুলো আরও অদ্ভুত হয়ে উঠল। সময় যেন আগের চেয়ে ধীরে চলতে লাগল। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ বদলাত, কিন্তু আমার মনে হতো—প্রতিটি দিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাকে পরীক্ষা করছে।

খোয়াজপুরের সেই কলেজের নোটিশ বোর্ডে ক্লাস শুরুর তারিখ দেখে বুকের ভেতর আনন্দের সঙ্গে অজানা এক ভয় ঢুকে পড়ল। নতুন শিক্ষক, নতুন সহপাঠী, নতুন ভবন, নতুন নিয়ম—সবকিছু যেন দূর থেকে হাত নেড়ে ডাকছে, আবার কাছে গেলে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ও দেখাচ্ছে।

সেই আগের রাতটিতে ঠিকমতো ঘুম এল না। বারবার মনে হচ্ছিল, ব্যাগে খাতা আছে তো? কলম নেওয়া হয়েছে তো? কোন জামা পরব? কাউকে চিনব তো? ক্লাসে গিয়ে কোথায় বসব? প্রশ্নগুলো ছোট ছিল, কিন্তু তাদের শব্দ আমার বুকের ভেতর বড় হয়ে উঠছিল।

২. ভোরের সাদা আলো

মাদারীপুরের খোয়াজপুরের সেই ভোরে, শেষ রাতের নিস্তব্ধতা পেরিয়ে আলো ফুটল। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছিল ধীরে ধীরে—মনে হচ্ছিল, আকাশ নিজেই যেন আমার নতুন দিনের জন্য পর্দা সরাচ্ছে। উঠোনে শিশির ভেজা গন্ধ, বাতাসে শেফালির নরম সুবাস, আর দূরে কোথাও পাখির ডাক—সব মিলিয়ে সকালটি কেবল সকাল ছিল না; ছিল নতুন জীবনের ছোট্ট উদ্বোধন।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে একবার পেছনে তাকালাম। যে ঘর, যে উঠোন, যে পরিচিত রাস্তা এতদিন আমাকে ঘিরে রেখেছিল, সেদিন তাদেরও আলাদা লাগছিল। মনে হচ্ছিল, তারা সবাই নীরবে বলছে—যাও, আরেকটু বড় হয়ে এসো।

রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে দেখলাম, আরও অনেকে একই দিকে যাচ্ছে। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে বিস্ময়, কারও হাঁটায় আত্মবিশ্বাস, কারও কাঁধে অস্বস্তি। আমরা কেউ কাউকে ভালো করে চিনতাম না, তবু সেদিন আমাদের সবার গন্তব্য এক ছিল—কলেজের দরজা।

৩. কৃষ্ণচূড়ার করিডর

সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের কাছাকাছি পৌঁছেই রাস্তার দুপাশে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলো চোখে পড়ল। বাতাসে দুলতে দুলতে তারা যেন নতুনদের জন্য অভ্যর্থনার পতাকা তুলে রেখেছে। লাল ফুলের নিচ দিয়ে হাঁটার সময় মনে হচ্ছিল, আমি কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠানে ঢুকছি না; ঢুকছি এমন এক জগতে, যেখানে প্রতিটি করিডর ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায়।

ক্যাম্পাসে ঢুকতেই চারদিকে মানুষের ভিড়। খোয়াজপুরের শান্ত পরিবেশের মধ্যে সেদিন কলেজপ্রাঙ্গণ যেন হঠাৎ তরুণ স্বপ্নের মেলায় পরিণত হয়েছিল। কেউ পরিচিত বন্ধু খুঁজছে, কেউ নোটিশ বোর্ডের দিকে ছুটছে, কেউ আবার এক কোণে দাঁড়িয়ে সবকিছু মুগ্ধ চোখে দেখছে। আমারও মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্যগুলো যত দ্রুত চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে, তার চেয়েও দ্রুত বদলে যাচ্ছে আমার ভেতরের মানুষটি।

স্কুলের কথা মনে পড়ল। ক্লাস ওয়ানে ঢোকার জন্য যে ছোটাছুটি, প্রথম বেঞ্চ দখলের যে যুদ্ধ, ঘণ্টা বাজার আগেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা—সব যেন একসঙ্গে ফিরে এল। কিন্তু কলেজের দরজায় দাঁড়িয়ে বুঝলাম, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ের ধরন বদলায়। আগে বেঞ্চ দখল করতে দৌড়াতাম, এখন জায়গা খুঁজছি নিজের পরিচয়ের।

৪. রুম নম্বরের ভিড়ে

প্রথম দিনের সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল—কোন রুমে ক্লাস হবে। নোটিশ বোর্ডের সামনে ভিড় জমে গেল। অনেকে মাথা উঁচু করে তাকাচ্ছে, কেউ আবার অন্যের কাঁধের ফাঁক দিয়ে নিজের বিভাগ খুঁজছে। আমিও ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে রুম নম্বর খুঁজছিলাম। তখন মনে হলো, জীবনের অনেক বড় প্রশ্নও বোধ হয় এমনই—উত্তর সামনে লেখা থাকে, কিন্তু ভিড়ের কারণে আমরা তা পড়তে পারি না।

অবশেষে রুম নম্বর পেলাম। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বুকের ভেতর অদ্ভুত শব্দ হচ্ছিল। দরজার সামনে গিয়ে এক মুহূর্ত থামলাম। ভেতরে অনেকেই বসে গেছে। কেউ ফিসফিস করছে, কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে, কেউ নতুন খাতার প্রথম পাতায় নাম লিখছে।

আমি শেষের দিকের একটি বেঞ্চে বসে পড়লাম। স্কুলজীবনে সামনে বসার অভ্যাস থাকলেও সেদিন পিছনের বেঞ্চটিই নিরাপদ মনে হলো। নতুন পরিবেশে মানুষ অনেক সময় নিজেকে লুকিয়ে রাখতেই স্বস্তি পায়। কিন্তু লুকিয়ে থেকেও কি সত্যিই নিজেকে বাঁচানো যায়? শিক্ষার আলো তো শেষ বেঞ্চেও পৌঁছায়, যদি চোখ খোলা থাকে।

৫. প্রথম ক্লাস

কিছুক্ষণ পর শিক্ষক ঢুকলেন। মুহূর্তেই কক্ষের ফিসফাস থেমে গেল। তাঁর চোখে কঠোরতা ছিল না, বরং এমন এক মমতা ছিল যা নতুনদের অস্বস্তি বুঝতে পারে। তিনি প্রথমে পরিচয় জানতে চাইলেন, তারপর ধীরে ধীরে বললেন—কলেজ শুধু বই পড়ার জায়গা নয়; এখানে মানুষ নিজের দায়িত্ব, সময়ের মূল্য, প্রশ্ন করার সাহস এবং ব্যর্থতা থেকে উঠে দাঁড়ানোর শিক্ষা পায়।

কথাগুলো শুনে মনে হলো, প্রথম দিনটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি আসলে এক ধরনের আয়না। সেই আয়নায় আমরা নিজেদের দেখছি—কে কী হতে চাই, কতদূর যেতে চাই, কিসে ভয় পাই, কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।

পরিচয় পর্বে সবার নাম শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি নামের পেছনে আলাদা গল্প আছে। কেউ দূর গ্রাম থেকে এসেছে, কেউ শহরের পরিচিত রাস্তা পেরিয়ে; কারও চোখে স্বপ্নের নীল আলো, কারও মুখে দ্বিধা। আমরা হয়তো তখনও বন্ধু ছিলাম না, কিন্তু একই কক্ষে বসে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর অভিজ্ঞতা আমাদের অদৃশ্য এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল।

৬. ক্যাম্পাসের প্রথম বিকেল

ক্লাস শেষ হলে সবাই ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এল। সকালবেলার উত্তেজনা তখন নরম হয়ে এসেছে। করিডোরের দেয়াল, সিঁড়ির ধাপ, জানালার গ্রিল, মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ—সব যেন একটু একটু করে পরিচিত হয়ে উঠছে।

কেউ ফোনে বাড়িতে খবর দিচ্ছে, কেউ নতুন বন্ধুর সঙ্গে হাসছে, কেউ আবার চুপচাপ হাঁটছে। আমার মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটি খুব বড় কোনো ঘটনা নয়, তবু এর ভেতর এমন কিছু আছে যা বহু বছর পরও মনে থাকবে। কারণ জীবনের সব বড় পরিবর্তন শব্দ করে আসে না; অনেক সময় তারা আসে একটিমাত্র দরজা পেরোনোর মতো নীরবে।

বাড়ি ফেরার পথে কৃষ্ণচূড়ার দিকে আবার তাকালাম। সকালের সেই লাল ফুলগুলো বিকেলের আলোয় আরও শান্ত। মনে হলো, তারা যেন বলছে—আজ তুমি শুধু কলেজে ঢোকোনি, তুমি নিজের ভিতরেও নতুন এক দরজা খুলেছ।

৭. স্মৃতির বীজ

দিনের শেষে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যে আনন্দ মিশে ছিল। মনে হচ্ছিল, মনের ডায়েরিতে আজ একটি নতুন পাতা লেখা হয়ে গেছে। হয়তো পাতাটিতে নিখুঁত বাক্য নেই, কোথাও কোথাও দ্বিধার কালি লেগে আছে, কোথাও অপ্রস্তুত হাসির দাগ; তবু সেটিই আমার নিজের লেখা।

কলেজে প্রথম দিন আমাকে শিখিয়েছিল—নতুন জায়গায় অস্বস্তি থাকা স্বাভাবিক, প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক, ভয় থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভয়কে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই মানুষের বড় হয়ে ওঠা।

আজ অনেক স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে। কার পাশে বসেছিলাম, কে প্রথম কথা বলেছিল, শিক্ষক ঠিক কোন বাক্যে উপদেশ শেষ করেছিলেন—সব মনে নেই। কিন্তু সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে আমি ভুলিনি। সে ভয় পেয়েছিল, তবু ঢুকেছিল। সে জানত না সামনে কী আছে, তবু হাঁটতে শুরু করেছিল। জীবনের অনেক পথই তো এমন—পুরো মানচিত্র হাতে থাকে না, শুধু প্রথম পদক্ষেপটি নিতে হয়।

তাই ‘কলেজে প্রথম দিন’ আমার কাছে কেবল একটি দিনের গল্প নয়; এটি শৈশব থেকে তারুণ্যে পা রাখার এক নরম, উজ্জ্বল, খানিকটা কাঁপা-কাঁপা মুহূর্ত। সেই মুহূর্তের ভাঁজে আজও শিশির জমে থাকে, কৃষ্ণচূড়া দোলে, আর এক তরুণ মনে মনে বলে—আমি শুরু করেছি।

━━━━━━ ✦ ━━━━━━

— সমাপ্ত —

05

শীতের সবুজ

মানবিক গল্প | বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাগাজিন / সাহিত্য বিভাগ

কুয়াশা, শীত, দরিদ্রতা এবং একজন অসহায় মানুষের কাঁপতে থাকা হাত থেকে জন্ম নেওয়া মানবিকতার কাব্যিক-বাস্তব গল্প।

মানবিক গল্পসমাজচেতনাকাব্যিক বাস্তব
📄 PDF পড়ুন⬇️ PDF Downloadসূচিতে যান

মানবিক গল্প | বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাগাজিন / সাহিত্য বিভাগ

লেখক: লিয়াকত হোসেন (লালন)

“কুয়াশা সবকিছু ঢেকে দিতে পারে; কিন্তু একজন মানুষের কাঁপতে থাকা হাত, আরেকজন মানুষের চোখ এড়িয়ে যায় না।”

১. কুয়াশার ভিতর দিয়ে

পৌষের শেষ দিক। রাতের শেষ প্রহরে গ্রামটা যেন সাদা কাগজের ওপর ফেলে রাখা এক মুঠো তুলোর মতো নিঃশব্দ হয়ে আছে। বাঁশবাগানের মাথা দেখা যায় না, পুকুরঘাটের সিঁড়ি দেখা যায় না, এমনকি উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছটাও কুয়াশার ভেতর নিজের ছায়া হারিয়ে ফেলেছে। শুধু শোনা যায়—টুপ, টুপ, টুপ—পাতা থেকে শিশির ঝরে পড়ার শব্দ। মনে হয়, আকাশ চুপচাপ কাঁদছে।

শীতকে আমি সেদিন কোনো ঋতু বলে মনে করিনি; মনে হয়েছিল, সে এক বুড়ি—হিমেল বুড়ি। সারারাত সে ঘুরে বেড়িয়েছে, কারও কাঁধে কাঁথা টেনে দিয়েছে, কারও দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকে হাড়ে হাড়ে শীত ধরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি সে দাঁড়িয়ে থেকেছে তাদের পাশে, যাদের শরীরে কাপড় নেই, যাদের ঘরে আগুন নেই, যাদের ভরসা বলতে শুধু অপেক্ষা—কেউ কি একবার হাত বাড়াবে?

আঁচড়: শীতের সকালগুলো সুন্দর; কিন্তু সব মানুষের জন্য সুন্দর নয়। কারও কাছে কুয়াশা কবিতা, কারও কাছে কুয়াশা শাস্তি।

২. দরজার বাইরে যে দাঁড়িয়ে ছিল

ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম, সূর্য উঠেছে; কিন্তু তার মুখ দেখা যায়নি। দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দে ঘরটা আরও ঠান্ডা লাগছিল। চাদরটা শরীরের ওপর আরও জড়িয়ে দরজা খুললাম। বাইরে পা রাখতেই শিশিরভেজা বাতাস যেন অদৃশ্য আঙুল দিয়ে গায়ের প্রতিটি লোম ছুঁয়ে দিল।

চোখ সয়ে আসার পর হঠাৎ দেখলাম—আমাদের বাড়ির পাশের কাঁচা রাস্তার ধারে একজন দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে মানুষ বলেও চিনতে পারিনি; কুয়াশা তাকে প্রায় মুছে দিয়েছিল। একটু পরে দেখলাম, সে সবুজ। পাশের বাড়ির অসহায় ছেলেটা। তার গায়ের পাতলা জামাটা ভিজে কাঁপছে, হাঁটু পর্যন্ত পুরোনো প্যান্ট, পা দুটো খালি। সে দু’হাত বুকের কাছে গুঁজে রেখেছে, যেন নিজের শরীরের ভেতর থেকেই একটু উষ্ণতা ধার করতে চায়।

সবুজ আমাকে দেখেই হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই হাসি হাসি ছিল না; ঠোঁটের কোণে জমে থাকা শীতের কাঁপুনি মাত্র। তার চোখে কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো দাবি ছিল না। কেবল এমন এক নীরব প্রশ্ন ছিল, যার উত্তর দিতে গেলে বুকের ভেতরটা ছোট হয়ে আসে।

আঁচড়: সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো কখনও শব্দ করে আসে না। তারা আসে এক জোড়া কাঁপতে থাকা চোখ হয়ে।

৩. চাদরের হিসাব

আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। নিজের গায়ের চাদরটা তখনও উষ্ণ। ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত হিসাব শুরু হলো—এই চাদরটা দিলে আমি ঠান্ডা পাব; না দিলে সবুজ আরও কাঁপবে। মানুষের জীবনের বড় বড় নীতিকথা এমন সাধারণ মুহূর্তেই পরীক্ষা নেয়।

হঠাৎ মনে হলো, শীতের সেই হিমেল বুড়ি নিশ্চয়ই সবুজের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। সে হয়তো আমাকে দেখছে, আমার দ্বিধা দেখছে, আমার হাতের চাদর দেখছে। সে হয়তো ভাবছে—মানুষ কি কেবল নিজের উষ্ণতা বাঁচিয়ে রাখার জন্য জন্মায়?

আর ভাবতে পারলাম না। চাদরটা খুলে সবুজের কাঁধে জড়িয়ে দিলাম। সে প্রথমে অবাক হয়ে তাকাল, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর চাদরের ভাঁজ দু’হাতে ধরে বুকের কাছে টেনে নিল। তার কাঁপুনি তখনও থামেনি; কিন্তু চোখের ভেতরটায় এক ফালি আলো জ্বলে উঠল।

আমি ঠান্ডা পেলাম, সত্যি। কিন্তু সেই ঠান্ডা আর আগের মতো লাগল না। মনে হলো, শরীরের ওপর থেকে একটা চাদর খুলেছি; অথচ বুকের ভেতরে আরেকটা অদৃশ্য চাদর পেয়ে গেছি।

আঁচড়: উষ্ণতা কমে যায় না; ভাগ করলে তার রূপ বদলায়। এক শরীর থেকে আরেক শরীরে গিয়ে সে মানবতা হয়ে ওঠে।

৪. এক সবুজ থেকে লক্ষ সবুজ

ঘরে ফিরে এসে আর আগের মতো বসে থাকতে পারলাম না। জানালার কাঁচে জমে থাকা শিশিরের ফোঁটাগুলো আমাকে বারবার সবুজের চোখের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ভাবলাম, সবুজ কি একা? এই শীতের সকালে শহরের ফুটপাতের পাশে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, বস্তির টিনের ঘরে, নদীর পাড়ের ভাঙা কুঁড়েঘরে কত সবুজ কাঁপছে—নাম আলাদা, মুখ আলাদা; কিন্তু শীতের কাছে তাদের পরিচয় একই: তারা অসহায়।

আমরা অনেক সময় শীতকে উপভোগ করি—নতুন পিঠা, গরম চা, রঙিন সোয়েটার, পিকনিক, ছবি। এসবের মধ্যে কোনো দোষ নেই। কিন্তু একই শীত যখন কারও জন্য আনন্দ, আর কারও জন্য আতঙ্ক হয়ে ওঠে, তখন সমাজের আয়নাটা খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। সেই আয়নায় আমাদের মুখও দেখা যায়—আমরা কতটা মানুষ, কতটা দর্শক, কতটা দায়িত্ববান।

সবুজের কাঁধে দেওয়া একটি চাদর হয়তো পৃথিবী বদলে দেয় না। কিন্তু পৃথিবী বদলানোর শুরু অনেক সময় এতটুকু কাজ দিয়েই হয়। একটি দরজা খুলে যায়, একটি হাত এগিয়ে যায়, একটি মানুষ অন্য মানুষের শীত বুঝতে শেখে।

আঁচড়: বড় দান সবসময় বড় জিনিস নয়; বড় দান হলো ঠিক সময়ে দেওয়া ছোট উষ্ণতা।

৫. শেষ দৃশ্য: আশার আলো

সেদিন দুপুরে কুয়াশা একটু পাতলা হলো। উঠোনের আমগাছ, জামগাছ, লিচুগাছ ধীরে ধীরে দেখা দিতে লাগল। নারকেলগাছের মাথায় রোদ পড়েছে। আমি দূর থেকে দেখলাম, সবুজ চাদরটা জড়িয়ে হাঁটছে। তার পা এখনও খালি, জীবন এখনও কঠিন; তবু হাঁটার ভঙ্গিতে যেন একটুখানি ভরসা ফিরে এসেছে।

আমার মনে হলো, সবুজ শুধু একজন দরিদ্র ছেলে নয়; সে আমাদের সমাজের বিবেক। সে আমাদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়, তবু হারিয়ে যায় না। আমরা দরজা খুললেই তাকে দেখতে পাই। আর না খুললে—আমাদের অন্ধত্বই শুধু বড় হয়।

আসুন, শীত নামার আগেই আমরা ঘরের পুরোনো চাদর, অতিরিক্ত কম্বল, অব্যবহৃত সোয়েটারগুলো বের করি। শুধু বস্তু দিই না—সম্মান দিই, কথা বলি, পাশে দাঁড়াই। কারণ মানুষ বেঁচে থাকে শুধু শরীরের উষ্ণতায় নয়; মানুষ বেঁচে থাকে আরেক মানুষের মমতায়।

হিমেল বুড়ি আবার আসবে। প্রতি বছরই আসবে। কিন্তু সে যেন আর কোনো সবুজকে কাঁপতে দেখে একা কাঁদতে না হয়। আমাদের হাতের উষ্ণতা যদি একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ে, তবে কুয়াশার ভেতর থেকেও একদিন দেখা যাবে—শীতের বুকেও সবুজ জন্মায়।

সম্পাদনা-নোট: গল্পটি মূল ভাবনা অক্ষুণ্ণ রেখে দৃশ্য, সংলগ্নতা, প্রতীক ও সমাপ্তির শক্তি বাড়িয়ে পুনর্গঠিত করা হয়েছে।

উপন্যাস ও ধারাবাহিক লেখা

এখানে উপন্যাস বা বড় ধারাবাহিক লেখার অধ্যায়ভিত্তিক index রাখা যাবে।

Coming Shelf

নতুন উপন্যাসের জন্য অধ্যায় তালিকা

প্রথম অধ্যায়, দ্বিতীয় অধ্যায়, চরিত্র পরিচিতি, লেখকের নোট—সবকিছু একই compact section-এ সাজানো যাবে।

  • অধ্যায় ০১ — শুরুর আলো
  • অধ্যায় ০২ — চরিত্রের ভেতরকার সংঘাত
  • অধ্যায় ০৩ — প্রেম, সমাজ ও বাস্তবতা

সাংস্কৃতিক ও ভাবনামূলক লেখা

দেশপ্রেম, সমাজচেতনা, মানবিকতা ও সংস্কৃতি নিয়ে লেখা অংশগুলোর জন্য আলাদা shelf। নতুন সংযুক্ত “শীতের সবুজ” মানবিক গল্পটি এখানে relevant cultural position হিসেবেও রাখা হলো।

🇧🇩

স্বাধীনতার নায়ক

বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা ও জাতির সংগ্রামী আত্মপরিচয়কে ঘিরে লেখা।

দেশপ্রেমঐতিহ্য
🌾

বাংলা মা

জন্মভূমি, নদী, মাঠ, প্রকৃতি ও বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসার কাব্যিক প্রকাশ।

বাংলাদেশমাতৃভূমি
⚖️

বাল্য বিবাহ

গ্রামীণ বাস্তবতা, সামাজিক কুসংস্কার ও বাল্যবিবাহের করুণ পরিণতি।

সামাজিক সচেতনতাবাস্তবতা
💭

মন

মানবমনের রহস্য, আবেগ, ব্যথা ও ভালোবাসার ভেতরকার যাত্রা।

ভাবনামানবমন
🧣

শীতের সবুজ

শীতের সকালে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান—মানবতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের গল্প।

মানবিকতাসমাজচেতনা
📄 PDF পড়ুন⬇️ PDF DownloadStory Card

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ

কবিতা, গল্প, প্রকাশনা বা সাহিত্যিক কাজের জন্য যোগাযোগ।

Send a Message

Your message will be emailed to info@fmliakat.com.bd and saved as a private backup in cPanel.

Direct email fallback: info@fmliakat.com.bd

📎 Share a Document

Send a CV, proposal, project brief, PDF, Word, Excel or image. Max 5 MB.

📄